কুয়েতের আহমদি তেল শোধনাগার সংলগ্ন একটি ওয়ার্কশপে দীর্ঘ চার বছর ধরে পাইপ ফিটারের কাজ করছেন পাবনার দেলোয়ার হোসেন। মরুভূমির অসহ্য গরম আর প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিদিন বারো ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি করলেও মাস শেষে তার হাতে আসত মাত্র একশত বিশ কুয়েতি দিনার। অতিরিক্ত ওভারটাইম করলেও বেতন বাড়াত না মালিক, উপরন্তু আকামা নবায়নের সময় বিভিন্ন অজুহাতে নিজের পকেট থেকেই টাকা কেটে রাখা হতো। এমন সময় কুয়েতের একটি বড় মাল্টিন্যাশনাল মেইনটেন্যান্স কোম্পানি দেলোয়ারের কাজের দক্ষতা দেখে তাকে আড়াইশত দিনার বেতন, বিনামূল্যে ভালো আবাসন ও স্বাস্থ্যসুবিধাসহ চাকরির অফার লেটার দেয়।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে দেলোয়ার যখন বর্তমান কফিলের (স্পন্সর) কাছে গিয়ে রিলিজ বা তানাজুল (কাফালা পরিবর্তন) চাইলেন, তখন কফিল মুখের ওপর স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন—"রিলিজ পেতে হলে নগদ দেড় হাজার দিনার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, নয়তো শোগল খেয়ানাত বা কাজে অনুপস্থিতির (ইনকিতা আনিল আমাল) মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেব।" দেলোয়ারের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। নতুন একটি সুন্দর জীবনের হাতছানি সামনে পেয়েও এক নিষ্ঠুর স্পন্সরশিপের বেড়াজালে তিনি পুরোপুরি বন্দি হয়ে পড়লেন।
দেলোয়ার হোসেনের এই কান্না কেবল কোনো একক ব্যক্তির নয়; মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাফালা বা স্পন্সরশিপ ব্যবস্থার যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া হাজারো প্রবাসী শ্রমিকের নিত্যদিনের বাস্তব চিত্র এটি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুয়েত সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড ও শ্রমবাজারের ভারসাম্য বজায় রাখতে কাফালা ও কোম্পানি পরিবর্তনের আইনি কাঠামোতে যুগান্তকারী কিছু সংস্কার এনেছে। অতীতে মালিকের অনুমতি ছাড়া প্রবাসীদের কর্মস্থল পরিবর্তন সম্পূর্ণ অসম্ভব হলেও, বর্তমান শ্রম আইনে কফিল পরিবর্তনের কিছু সুস্পষ্ট আইনি পথ উন্মুক্ত হয়েছে। কুয়েতে কোম্পানি পরিবর্তন বা তানাজুল করার সর্বশেষ নিয়মাবলী, সরকারি শর্ত এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রতিটি প্রবাসী কর্মীর জন্যই বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
কুয়েতে কাফালা তানাজুল ও কোম্পানি পরিবর্তন আসলে কি? নতুন আপডেট কি?
কুয়েতের প্রচলিত আরবি পরিভাষায় ‘তানাজুল’ (تنازل) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো নিজের অধিকার অন্যের কাছে হস্তান্তর করা বা ছেড়ে দেওয়া। অভিবাসন আইনের ভাষায়, যখন একজন বর্তমান স্পন্সর বা কোম্পানি তার অধীনে থাকা কোনো বিদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান ও স্পন্সরশিপের অধিকার অন্য একটি নতুন কোম্পানির কাছে বৈধভাবে ছেড়ে দেয়, তখন সেই প্রক্রিয়াকে ‘কাফালা তানাজুল’ বা ‘কোম্পানি পরিবর্তন’ (Residency Transfer under Article 18) বলা হয়।
কুয়েত পাবলিক অথরিটি ফর ম্যানপাওয়ার (PAM) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং তথাকথিত ‘ভিসা বাণিজ্য’ বা মুক্ত ভিসার প্রতারণা বন্ধ করতে বেশ কিছু নতুন নীতি ও প্রশাসনিক সার্কুলার কার্যকর করেছে। সর্বশেষ আপডেটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. তিন বছরের অবিচ্ছিন্ন চাকরির শর্ত (3-Year Rule):
সর্বশেষ শ্রম অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো কর্মী যদি নতুন ভিসা নিয়ে কুয়েতে প্রবেশ করেন, তবে তাকে তার মূল স্পন্সর বা নিয়োগকর্তার অধীনে একটানা ন্যূনতম তিন বছর (৩ বছর) কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পর কর্মী চাইলে বর্তমান কফিলের সাধারণ ছাড়পত্র নিয়েই নতুন কোম্পানিতে ট্রান্সফার হতে পারবেন। তবে কফিল যদি রাজি থাকেন, তবে নির্দিষ্ট সরকারি স্থানান্তর ফি পরিশোধ সাপেক্ষে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অন্য কোম্পানিতে তানাজুল নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
২. পিএএম (PAM) স্থানান্তর ফি ও ক্যাটাগরি নিয়ম:
শ্রম বিভাগ এখন কোম্পানি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফি কাঠামো নির্ধারণ করেছে। সাধারণ বেসরকারি খাতের (আর্টিকেল ১৮) কর্মীরা যখন এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে বদলি হন, তখন নতুন কোম্পানিকে জনশক্তি কর্তৃপক্ষের পোর্টালে সরকারি স্থানান্তর ফি (Transfer Fee) পরিশোধ করতে হয়। কোম্পানি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই বৈধ শ্রম কোটা (কাদর বা লেবার ফাইল লিমিট) খালি থাকতে হবে।
৩. সরকারি প্রকল্প বা কন্ট্রাক্ট ভিসার (আর্টিকেল ১৮ হুকুমা) সীমাবদ্ধতা:
যারা সরাসরি সরকারি প্রজেক্ট বা কন্ট্রাক্ট ভিসায় কুয়েতে এসেছেন, তাদের ক্ষেত্রে বেসরকারি সাধারণ কোম্পানিতে তানাজুল নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারা শুধুমাত্র এক সরকারি প্রজেক্ট থেকে অন্য সরকারি প্রজেক্টের কাজের ভিসা পরিবর্তন করতে পারেন। তবে বিশেষ কিছু রাষ্ট্রীয় সাধারণ ক্ষমার সময় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ছাড়পত্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত সরকারি ফি দিয়ে সাধারণ প্রাইভেট সেক্টরে আসার সুযোগ মাঝেমধ্যে তৈরি হয়।
৪. খাদেম বা গৃহকর্মী ভিসা (আর্টিকেল ২০) থেকে কোম্পানিতে (আর্টিকেল ১৮) রূপান্তর:
কুয়েতের শ্রমবাজারের তীব্র শ্রমিক সংকট নিরসনে কুয়েত সরকার সময়ে সময়ে নির্দিষ্ট মেয়াদে একটি বিশেষ উইন্ডো বা সুযোগ উন্মুক্ত করে থাকে। সেই নির্দিষ্ট শর্তাবলীর আওতায় গৃহকর্মী ভিসায় থাকা কোনো কর্মী যদি তার বর্তমান কুয়েতি কফিলের অধীনে অন্তত এক বছর বৈধভাবে কাজ করে থাকেন এবং কফিল যদি কোনো আপত্তি না জানিয়ে লিখিত সম্মতি দেন, তবে নির্দিষ্ট রূপান্তর ফি (সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ দিনার) প্রদান সাপেক্ষে তাকে প্রাইভেট সেক্টর বা কোম্পানির ভিসায় রূপান্তর করা সম্ভব।
৫. ডিজিটাল ক্লিয়ারেন্স ও সাহেল বিজনেস পোর্টাল:
কাগজে-কলমে সই-সাবুদের পুরনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখন আর নেই। কোম্পানি পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটি এখন জনশক্তি কর্তৃপক্ষের ‘আশাল’ (Ashal) এবং কুয়েত সরকারের ‘সাহেল বিজনেস’ (Sahel Business) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করা যায়।
কুয়েতের শ্রম আইন, কর্মসংস্থান সংক্রান্ত নীতি এবং সর্বশেষ রেসিডেন্সি সার্কুলার জানতে সরাসরি কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (moi.gov.kw)-এর অফিশিয়াল পোর্টাল অনুসরণ করা উচিত।
কাদের জন্য প্রযোজ্য?
কোম্পানি পরিবর্তন ও কাফালা তানাজুলের এই আধুনিক নীতিমালা কুয়েতের বেসরকারি খাতের লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে পরিস্থিতির ভিন্নতা অনুযায়ী নিচের প্রবাসীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি:
১. প্রাইভেট সেক্টরে কর্মরত সাধারণ শ্রমিক (আর্টিকেল ১৮ আহলি):
বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সুপারমার্কেট, গ্যারেজ, ক্লিনিক, হোটেল কিংবা কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে যারা নিয়মিত ওয়ার্ক পারমিটে কর্মরত আছেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে বা ভালো সুযোগ পেলে তারা এই বিধিমালার অধীনে কোম্পানি পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন।
২. শ্রমিক শোষণ ও বকেয়া বেতনের শিকার হওয়া কর্মী:
যেসব প্রবাসী এমন কোম্পানিতে কাজ করছেন যেখানে টানা তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে বেতন বকেয়া রাখা হয়েছে, কাজের সময় পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছে কিংবা অতিরিক্ত সময় খাটিয়ে ওভারটাইম দেওয়া হয় না। কুয়েতি শ্রম আইনের ৪৪ ও ৪৮ ধারা অনুযায়ী তারা কফিলের সম্মতি ছাড়াই আদালতের মাধ্যমে একতরফা তানাজুল পাওয়ার অধিকার রাখেন।
৩. কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল বা ফাইল বন্ধ হওয়া কর্মী:
কুয়েতে অনেক সময় অসাধু মালিকদের কারণে কোম্পানির বাণিজ্যিক লাইসেন্স বাতিল হয় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের লেবার ফাইলকে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কোড ৭২ দিয়ে ব্লক করে দেয়। এমন কোম্পানির অধীনে থাকা নিরপরাধ কর্মীরা সরাসরি জনশক্তি কর্তৃপক্ষের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নিজেদের ফাইল নির্দোষ প্রমাণ করে অন্য ভালো কোম্পানিতে ট্রান্সফার নিতে পারেন।
৪. গৃহকর্মী ও ব্যক্তিগত চালক (আর্টিকেল ২০):
যারা বাসাবাড়িতে কাজ করছেন কিন্তু কোম্পানিতে গিয়ে নিয়মিত স্বাধীন চাকরি করতে চান। সরকারের বিশেষ অনুমোদিত সময়কালে কফিলের লিখিত ছাড়পত্র নিয়ে তারা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।
কুয়েত প্রবাসীদের জন্য এর প্রভাব ও করণীয়
কুয়েতের কাফালা ব্যবস্থার এই আধুনিকীকরণ সাধারণ প্রবাসী ভাইদের মর্যাদা, কাজের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিশাল বিপ্লব সাধন করেছে।
প্রবাসীদের জীবনের ওপর গভীর প্রভাব:
ন্যায্য পারিশ্রমিক ও দাসত্বমূলক প্রথার অবসান: অতীতে কফিলরা জানত যে কর্মী তাদের ইচ্ছার বাইরে কোথাও যেতে পারবে না, ফলে তারা প্রবাসীদের নামমাত্র বেতনে দিনের পর দিন খাটিয়ে নিত। এখন কোম্পানি পরিবর্তনের আইনি পথ সুগম হওয়ায় দক্ষ শ্রমিকরা তাদের যোগ্যতানুযায়ী দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেতনে অন্য কোম্পানিতে চলে যেতে পারছেন। ফলে নিয়োগকর্তাদের মধ্যেও কর্মীদের ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।
ভিসা বাণিজ্যের অবসান: ‘আজাদ ভিসা’ বা ফ্রি ভিসার নামে অতীতে কুয়েতে যে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, যেখানে প্রবাসীরা লাখ লাখ টাকা দিয়ে এসে কফিলকে বাৎসরিক চাঁদা দিতেন—সেই চক্রটি নতুন কড়াকড়ির কারণে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। তিন বছরের বাধ্যতামূলক কাজের শর্ত এবং ডিজিটাল মনিটরিংয়ের কারণে নামসর্বস্ব ভুয়া কোম্পানির দিন শেষ হয়ে আসছে।
ভুয়া ইনকিতা আনিল আমাল (Absconding Case)-এর ঝুঁকি: এখনো অনেক প্রতিহিংসাপরায়ণ কফিল আছেন, যারা কর্মীর পদত্যাগ বা রিলিজ চাওয়ার খবর শোনামাত্রই উল্টো সিস্টেমে গিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট করে দেন যে "এই কর্মী টাকা চুরি করে পালিয়ে গেছে।" এই একটি মিথ্যা মামলা প্রবাসীর পুরো ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে। এমন হলে কুয়েতে সাথে সাথে গ্রেপ্তার হয়ে ডিপোর্টেশনে যেতে হয়।
কুয়েতের শ্রমবাজারের বাস্তবতা ও প্রবাসী অধিকার নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রামাণ্য বিশ্লেষণ প্রকাশ করে থাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো (prothomalo.com), যা প্রবাসীদের আইনি সচেতনতা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক।
কুয়েত প্রবাসীদের জরুরি করণীয়:
১. কাজের চুক্তিপত্র (আমাল আকদ) নিজের কাছে রাখা: কাজে যোগ দেওয়ার সময় পাবলিক অথরিটি ফর ম্যানপাওয়ার অনুমোদিত যে মূল লেবার কন্ট্রাক্ট তৈরি হয়, সেটির একটি সিলযুক্ত কপি নিজের কাছে রাখুন। এই চুক্তিতে আপনার বেসিক বেতন, ছুটির শর্ত এবং নোটিশ পিরিয়ডের স্পষ্ট উল্লেখ থাকে।
২. হুট করে কাজ বন্ধ না করা: কোনো অবস্থাতেই কফিলের সাথে রাগারাগি করে কাজে যাওয়া বন্ধ করবেন না। আপনি যদি টানা সাত দিন বিনা নোটিশে কাজে অনুপস্থিত থাকেন, তবে কফিল বৈধভাবেই আপনার বিরুদ্ধে ‘পলাতক’ বা ইনকিতা কেস করার সুযোগ পেয়ে যাবে। সবসময় আইনি নোটিশ দিয়ে শান্তভাবে কথা বলুন।
৩. নতুন কোম্পানির নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা: যে কোম্পানিতে তানাজুল নিতে যাচ্ছেন, সেই কোম্পানি কুয়েতি আইনের চোখে পরিষ্কার কি না তা আগেই কোনো অভিজ্ঞ মন্দুব বা বন্ধুর মাধ্যমে যাচাই করে নিন। নতুন কোম্পানির ফাইল ব্লক থাকলে সেখানে গিয়ে আপনি নতুন কোনো বিপদে পড়তে পারেন।
৪. শ্রম আদালতে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সাহস রাখা: কফিল যদি বেতন বন্ধ রাখে বা শারীরিক/মানসিক নির্যাতন করে এবং রিলিজ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে কুয়েতের জাবরিয়া, ফরওয়ানিয়া বা আহমদি লেবার অফিসে (শুন) গিয়ে সরাসরি লিখিত দরখাস্ত দিন। কুয়েতের শ্রম আদালত প্রবাসীদের ন্যায্য অভিযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও পক্ষপাতহীনভাবে বিচার করে থাকে।
Step-by-Step কিভাবে করবেন / বিস্তারিত
আইনসম্মত উপায়ে কুয়েতে এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে ওয়ার্ক পারমিট স্থানান্তর বা তানাজুল করার পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে নিচে বর্ণনা করা হলো:
ধাপ ১: নতুন কোম্পানির অফার লেটার ও কোটা পরীক্ষা
নতুন যে প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে চান, তাদের কাছ থেকে লিখিত চাকরির অফার লেটার (Offer Letter) সংগ্রহ করুন।
নতুন কোম্পানির প্রতিনিধির (মন্দুব) মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে জনশক্তি বিভাগে তাদের কর্মী নিয়োগের পর্যাপ্ত কোটা (Approval Limit) অনুমোদিত আছে।
ধাপ ২: বর্তমান কফিলকে আইনি নোটিশ প্রদান ও তানাজুল ফর্মে স্বাক্ষর
বর্তমান কফিলকে আপনার চুক্তি অনুযায়ী অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগে লিখিত পদত্যাগপত্র (Resignation Letter) জমা দিন।
কফিল সম্মত হলে জনশক্তি কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত অফিশিয়াল ‘তানাজুল ফর্ম’ সংগ্রহ করুন।
সেই ফর্মে বর্তমান কোম্পানির অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী (ইতমাদ তৌকি) তার স্বাক্ষর ও কোম্পানির অফিশিয়াল সিলমোহর দেবেন। একই সাথে নতুন কোম্পানির স্বাক্ষরকারীও সেখানে তাদের সম্মতি ও সিলমোহর যুক্ত করবেন।
ধাপ ৩: পিএএম (PAM) পোর্টালে ডিজিটাল ট্রান্সফার আবেদন
নতুন কোম্পানির মন্দুব জনশক্তি কর্তৃপক্ষের ‘আশাল’ বা সাহেল বিজনেস পোর্টালে ঢুকে কর্মীর সিভিল আইডি ও তানাজুল পেপারের স্ক্যান কপি আপলোড করে ট্রান্সফারের জন্য আবেদন করবেন।
বর্তমান কফিলের পোর্টালে একটি ডিজিটাল কনফার্মেশন রিকোয়েস্ট যাবে। বর্তমান কফিল সিস্টেমে ‘Approve’ বাটনে ক্লিক করলেই ফাইলটি প্রথম ধাপ পার হবে।
জনশক্তি বিভাগ সমস্ত কাগজপত্র যাচাই করে ওয়ার্ক পারমিটের ডিজিটাল অনুমোদন দেবে। এরপর নতুন কোম্পানিকে নির্ধারিত সরকারি ফি অনলাইন কে-নেট পেমেন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
ধাপ ৪: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেসিডেন্সি ট্রান্সফার ও স্বাস্থ্যবীমা
ওয়ার্ক পারমিট ট্রান্সফার সফল হওয়ার পর নতুন কোম্পানির নামে কর্মীর বাৎসরিক স্বাস্থ্যবীমা (ধামান সিহি) পরিশোধ করতে হবে।
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেসিডেন্সি বিভাগের (ইমিগ্রেশন) সিস্টেমে গিয়ে আগের কোম্পানির স্পন্সরশিপ বাতিল করে নতুন কোম্পানির ফাইল নম্বরের অধীনে নতুন আকামা স্ট্যাম্পিং সম্পন্ন করা হবে।
ধাপ ৫: নতুন সিভিল আইডি ও কুয়েত মোবাইল আইডি ইস্যু
আকামা সফলভাবে ট্রান্সফার হওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাবলিক অথরিটি ফর সিভিল ইনফরমেশন (PACI)-এর সাইটে গিয়ে ৫ কুয়েতি দিনার ফি দিয়ে নতুন সিভিল আইডির আবেদন করতে হবে।
স্মার্টফোনে ‘Kuwait Mobile ID’ অ্যাপে লগইন করে রিফ্রেশ করলেই সেখানে নতুন কোম্পানির নাম ও নতুন মেয়াদের সিভিল আইডি কার্ড দৃশ্যমান হবে। এরপর সেলফ সার্ভিস মেশিন থেকে প্লাস্টিক কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।
সাধারণ ভুল ও জটিলতা এড়াতে সতর্কতা
তানাজুল বা কোম্পানি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সামান্যতম ভুল বড় ধরণের আইনি বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। নিচের সতর্কতাগুলো সব সময় মেনে চলুন:
১. কাগজপত্র চূড়ান্ত হওয়ার আগে পুরনো কাজ না ছাড়া:
অনেকে নতুন কোম্পানির মৌখিক আশ্বাসে বিশ্বাস করে পুরনো কর্মস্থলে কাজ করা বন্ধ করে দেন বা কফিলের সাথে চরম দুর্ব্যবহার শুরু করেন। মনে রাখবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার হাতে নতুন আকামার ডিজিটাল কনফার্মেশন স্লিপ না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি আইনগতভাবে পুরনো কফিলেরই অধীন। কোনো অবস্থাতেই কাজ ছেড়ে বসে থাকবেন না।
২. আকামা শেষ হওয়ার শেষ মুহূর্তে উদ্যোগ নেওয়া:
আপনার বর্তমান আকামার মেয়াদ শেষ হতে যখন আর মাত্র ৫-১০ দিন বাকি, তখন কোম্পানি পরিবর্তনের চেষ্টা করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের শামিল। কারণ তানাজুল হতে সাধারণত ২ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় লাগে। আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সিস্টেমে প্রতিদিন ২ দিনার করে ফাইন উঠতে থাকবে এবং ফাইল ব্লক হয়ে যাবে। আকামার মেয়াদ অন্তত তিন মাস বাকি থাকতেই তানাজুলের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করুন।
৩. দালাল বা ভুয়া মন্দুবের মাধ্যমে জালিয়াতি এড়ানো:
কুয়েতের বাজারে কিছু দালাল রয়েছে যারা বলে—"আমাকে ৩০০ দিনার দিন, কফিলের কোনো সই ছাড়াই আমি কম্পিউটার থেকে আপনার তানাজুল করিয়ে দেব।" এই প্রলোভনে ভুলেও পা দেবেন না। তারা জাল সিল বা ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে অনলাইনে চেষ্টা করে। ধরা পড়লে জালিয়াতির (Forgery) ফৌজদারি মামলায় আপনার নাম জড়িয়ে যাবে এবং আজীবনের জন্য কুয়েত থেকে বহিষ্কার হতে হবে।
৪. পাসপোর্ট কখনো কফিলের জিম্মায় ফেলে রাখবেন না:
কুয়েতি শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো কর্মীর পাসপোর্ট আটকে রাখার অধিকার কফিলের নেই। রিলিজের আলোচনার সময় নিজের মূল পাসপোর্ট এবং সিভিল আইডি সবসময় নিজের হেফাজতে রাখুন। কফিল পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করলে সরাসরি দূতাবাসের কল্যাণ শাখায় বা শ্রম আদালতে সাহায্য চান।
৫. আর্থিক লেনদেনের লিখিত প্রমাণ রাখা:
যদি কোনো চুক্তির অধীনে কফিলকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে তানাজুল নিতে হয়, তবে সেই অর্থ কোনো অবস্থাতেই হাতেনাতে ক্যাশ দেবেন না। ব্যাংকের মাধ্যমে ট্রান্সফার করুন অথবা কফিলের অফিশিয়াল রসিদ ও লিখিত চুক্তিপত্রে সই করিয়ে নিন, যাতে ভবিষ্যতে কফিল কোনো অর্থ দাবি বা প্রতারণা করতে না পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. কফিল যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তানাজুল (রিলিজ) দিতে না চায়, তবে কি শ্রম আদালতের মাধ্যমে কোম্পানি পরিবর্তন করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, যদি আপনার চাকরির মূল চুক্তির মেয়াদ (সাধারণত তিন বছর) আইনসম্মতভাবে পূর্ণ হয়ে থাকে এবং আপনি যথাযথ নোটিশ পিরিয়ড দিয়ে থাকেন, অথবা কফিল যদি নিয়মিত বেতন না দেয় বা শ্রম আইন লঙ্ঘন করে—তবে আপনি সংশ্লিষ্ট মুহাফাজার শ্রম আদালতে (ইদারা আল-আমাল) কফিলের বিরুদ্ধে ‘মালিকের সম্মতি ছাড়া তানাজুল’ (Transfer without sponsor consent)-এর আবেদন করতে পারেন। শ্রম আদালত তদন্ত করে কফিলের অবহেলা দেখতে পেলে মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাবলে সরাসরি কর্মীকে নতুন কোম্পানিতে ট্রান্সফার হওয়ার আইনি ছাড়পত্র দিয়ে থাকে।
২. খাদেম বা গৃহকর্মী ভিসা (আর্টিকেল ২০) থেকে কি সরাসরি প্রাইভেট কোম্পানিতে (আর্টিকেল ১৮) ভিসা পরিবর্তন সম্ভব?
উত্তর: সাধারণ নিয়মে এটি সবসময় উন্মুক্ত থাকে না। তবে কুয়েত সরকার যখন বিশেষ প্রশাসনিক সার্কুলার দিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য গৃহকর্মী থেকে কোম্পানির ভিসায় রূপান্তরের সুযোগ দেয়, কেবল তখনই এটি সম্ভব। এর জন্য প্রধান শর্ত থাকে—গৃহকর্মীকে তার বর্তমান কুয়েতি কফিলের অধীনে অন্তত এক বছর বৈধভাবে থাকতে হবে, কফিলকে লিখিতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনাপত্তি জানাতে হবে এবং নির্ধারিত সরকারি রূপান্তর ফি প্রদান করতে হবে।
৩. কুয়েতে এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে তানাজুল হতে সাধারণত কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে এবং উভয় কোম্পানির ডিজিটাল সিস্টেমে কোনো আইনি ব্লকেজ না থাকলে আধুনিক ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সাধারণত ৭ থেকে ১৫ কর্মদিবস সময় লাগে। তবে কোনো নথিপত্রে ত্রুটি থাকলে বা সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সে সময় লাগলে তা সর্বোচ্চ এক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ডিসক্লেইমার: তথ্যটি Kuwait Ministry of Interior (moi.gov.kw) ও কুয়েত পাবলিক অথরিটি ফর ম্যানপাওয়ার (PAM)-এর সর্বশেষ শ্রম অধ্যাদেশ অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আপডেট। শ্রম ও অভিবাসন সংক্রান্ত নীতিমালা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে যেকোনো সময় পরিবর্তনশীল। যেকোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে অনুমোদিত সরকারি শ্রম পরামর্শক বা দূতাবাসের সহায়তা নেওয়া সমীচীন।
লেখক: Yasin Sarfuddin