কুয়েত বিমানবন্দর ব্যাগেজ রুলস ও কাস্টমস নির্দেশিকা

0

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা সহিদুল ইসলাম। দীর্ঘ আড়াই বছর পর দেশ থেকে দুই মাসের ছুটি কাটিয়ে কুয়েতে ফিরছিলেন। ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর বৃদ্ধা মা পরম মমতায় ব্যাগের এক কোণে গুঁজে দিয়েছিলেন নিজের হাতে বানানো কাঁচামের আচার, দুটি খাঁটি সরিষার তেলের বোতল, দেশি ইলিশের শুঁটকি আর ছেলের কোমরের ব্যথার জন্য স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তার থেকে আনা কিছু ব্যথানাশক ট্যাবলেট। সহিদুল ভেবেছিলেন, প্রবাসের কষ্টকর জীবনে মায়ের হাতের এই খাবারগুলোই হবে পরম সান্ত্বনা।

কিন্তু কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৪-এ নেমে লাগেজ বেল্ট থেকে মালামাল সংগ্রহ করে যখন গ্রিন চ্যানেলের স্ক্যানিং মেশিনের সামনে পৌঁছালেন, তখনই ঘটে বিপত্তি। লাগেজটি এক্স-রে মেশিনে ঢুকতেই স্ক্যানার অফিসার হাত দিয়ে সংকেত দিয়ে কনভেয়ার বেল্ট থামিয়ে দিলেন। সহিদুলকে নিয়ে যাওয়া হলো কাস্টমসের তল্লাশি টেবিলে। একে একে ব্যাগ থেকে বের করা হলো তেল চুইয়ে পড়া সেই তেলের বোতল, খোলা প্যাকেটে থাকা শুঁটকি এবং প্রেসক্রিপশনবিহীন সেই ব্যথানাশক ট্যাবলেটের পাতা। তেলের কারণে পুরো ব্যাগের জামাকাপড় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া অজ্ঞাত ওষুধ বহনের দায়ে সহিদুলকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাস্টমস ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জেরার মুখোমুখি হতে হলো। ভাগ্য ভালো যে ওষুধগুলো নিষিদ্ধ মাদকের তালিকাভুক্ত ছিল না, ফলে দীর্ঘ মুচলেকা ও জরিমানা দিয়ে তিনি কোনোমতে ছাড়া পান।

সহিদুলের মতো এমন তিক্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা কুয়েতগামী অনেক প্রবাসী বাঙালির জন্যই অপরিচিত নয়। দেশের প্রতি ভালোবাসা, পরিবারের হাতের স্বাদ আর অজ্ঞতার কারণে প্রবাসীরা এমন কিছু জিনিস লাগেজে বহন করেন, যা কুয়েতের কাস্টমস আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বা বিশেষ শর্তসাপেক্ষ। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা এবং কুয়েত শুল্ক বিভাগের সর্বশেষ বিধিমালার কারণে ব্যাগেজ ও মালামাল পরিবহনে এখন অভূতপূর্ব কড়াকড়ি চলছে। সামান্য অসাবধানতায় বিমানবন্দর থেকেই সরাসরি জেলখানা কিংবা নিজ দেশে ডিপোর্টেশনের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।


কুয়েত এয়ারপোর্ট ব্যাগেজ ও কাস্টমস রুলস আসলে কি? নতুন আপডেট কি?

কুয়েত জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস (General Administration of Customs) এবং দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (DGCA) দেশের নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কুয়েতের সমস্ত বিমানবন্দর টার্মিনালে (টার্মিনাল ১, টার্মিনাল ৪ এবং টার্মিনাল ৫) ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা ও শুল্ক নীতিমালায় ব্যাপক সংস্কার এনেছে। একেই সাধারণত কুয়েত বিমানবন্দর ব্যাগেজ ও কাস্টমস রুলস বলা হয়।

সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, বিমানবন্দরে ব্যাগের বাহ্যিক কাঠামো থেকে শুরু করে ব্যাগের ভেতরের প্রতিটি সূক্ষ্ম জিনিসের ওপর কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স ও এআই এক্স-রে মেশিনের মাধ্যমে দ্বৈত তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এই নতুন আপডেটের প্রধান দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. ব্যাগেজের শারীরিক গঠন ও প্যাকিং সংক্রান্ত নতুন মানদণ্ড:
অতীতে বহু প্রবাসী কাপড় বা প্লাস্টিকের বস্তা, সুতা দিয়ে পেঁচানো কার্টন কিংবা অনিয়মিত আকারের ব্যাগ নিয়ে বিমানে উঠতেন। কুয়েত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো প্রকার অনিয়মিত আকারের (Irregular Shape), গোলাকার বা দড়ি দিয়ে বাঁধা লাগেজ কনভেয়ার বেল্টে গ্রহণ করা হবে না। প্রতিটি ব্যাগের অন্তত একটি তল সমতল (Flat surface) হতে হবে। সুতা বা স্কচটেপ পেঁচানো কার্টনে কোনো শক্ত হাতল না থাকলে তা সরাসরি রিজেক্ট করা হচ্ছে।

২. ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস বহনে কঠোর বিধিনিষেধ:
কুয়েতে মাদক ও অবৈধ ড্রাগসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বা ভারতীয় উপমহাদেশে সচরাচর ব্যবহৃত বহু সাধারণ ঘুমের ওষুধ, নার্ভের ওষুধ বা ব্যথানাশক কুয়েতের আইনে ‘ক্লাস-এ’ বা ‘ক্লাস-বি’ সিডিউলড নারকোটিক ড্রাগ হিসেবে তালিকাভুক্ত। বিশেষ করে ট্রামাডল (Tramadol), লিরিকা (Lyrica বা Pregabalin), ডায়াজেপাম (Diazepam), ক্লনাজেপাম এবং কিছু কাশির সিরাপের সামান্য একটি ফাইল ব্যাগে পাওয়া গেলে তা মাদক চোরাচালান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ডাক্তারের অফিসিয়াল প্রেসক্রিপশন এবং নোটারি সত্যায়িত কাগজ ছাড়া এসব ওষুধ বহন সম্পূর্ণ বেআইনি।

৩. খাদ্যদ্রব্য ও পচনশীল সামগ্রী আমদানি নিয়ন্ত্রণ:
খোলা পলিথিনে মোড়ানো মাংস, দেশি কাঁচা মাছ, ডেইরি পণ্য (যেমন কাঁচা দুধ, ছানা, খাঁটি মাখন) এবং কাঁচা সুপারি ও পান পাতা বহনের ওপর নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। শুঁটকি মাছ যদি বাণিজ্যিকভাবে ভ্যাকুয়াম সিল করা না থাকে এবং গন্ধ ছড়ানোর সামান্যতম আশঙ্কা থাকে, তবে তা তাৎক্ষণিক বাজেয়াপ্ত করে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পানের সাথে ব্যবহৃত জর্দা ও গুল কুয়েতের পাবলিক হেলথ বিভাগের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় সীমিত পরিমাণের বেশি আনলে বাজেয়াপ্ত ও জরিমানা করা হচ্ছে।

৪. নগদ অর্থ ও মূল্যবান ধাতু (স্বর্ণ) ঘোষণা আইন (Financial Disclosure):
কুয়েতের মানি লন্ডারিং ও টেরর ফাইন্যান্সিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, কোনো যাত্রী যদি ৩,০০০ কুয়েতি দিনার (বা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা, প্রায় ১০,০০০ মার্কিন ডলার) এর অধিক নগদ অর্থ, ট্রাভেলার্স চেক বা স্বর্ণালঙ্কার সাথে বহন করেন, তবে বিমানবন্দরে নামার সাথে সাথে কাস্টমসের নির্ধারিত 'ডিক্লারেশন ফর্ম' পূরণ করতে হবে। এই ঘোষণা না দিয়ে গ্রিন চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা করলে সম্পূর্ণ অর্থ বা স্বর্ণ জব্দ করা হবে এবং যাত্রীকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।

৫. ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও পাওয়ার ব্যাংক সংক্রান্ত এভিয়েশন নিরাপত্তা:
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিচালিত পাওয়ার ব্যাংক, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যাটারি বা ভ্যাপ (ই-সিগারেট) কোনো অবস্থাতেই চেক-ইন ব্যাগেজে (বড় লাগেজে) দেওয়া যাবে না। এগুলো বাধ্যতামূলকভাবে হাতব্যাগে (কেবিন ব্যাগ) রাখতে হবে। লাগেজের ভেতর পাওয়ার ব্যাংক পাওয়া গেলে লাগেজ হোল্ডে আটকে দেওয়া হয় এবং ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়। ড্রোন ক্যামেরা বা হাই-পাওয়ার দূরবীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও ব্যাগেজ নিয়মাবলী নিয়মিত প্রচার করে থাকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (caab.gov.bd), যার সাথে কুয়েত সরকারের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বিধির সরাসরি সমন্বয় রয়েছে।

কাদের জন্য প্রযোজ্য?

কুয়েত বিমানবন্দরের এই শুল্ক ও ব্যাগেজ নীতিমালা যেকোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে কুয়েতে অবতরণকারী বা কুয়েত থেকে বহির্গমনকারী প্রতিটি যাত্রীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। তবে আমাদের কমিউনিটির প্রেক্ষাপটে এটি প্রধানত নিচের ক্ষেত্রগুলোতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে:

১. ছুটি কাটিয়ে দেশ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী প্রবাসী:
যারা দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মস্থলে ফিরছেন, তারা সাধারণত পরিবারের জন্য হরেক রকমের দেশি খাদ্য, মসলা, চাল-ডাল এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের ওষুধপত্র নিয়ে আসেন। তাদের লাগেজে কাস্টমসের তল্লাশি সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে।

২. নতুন ভিসাধারী ও প্রথমবার কুয়েতগামী কর্মী:
নতুন কর্মীরা অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগী বা পরিচিত কারো পরামর্শে অননুমোদিত সামগ্রী ব্যাগে ভরে নিয়ে আসেন। তারা নিয়মকানুন না জানার কারণে বিমানবন্দরে প্রথম দিনেই মারাত্মক ভীতি ও আইনি জটিলতায় পড়েন।

৩. পরিবার ও নারী যাত্রী:
ডিপেন্ডেন্ট ভিসায় যারা সন্তানদের নিয়ে কুয়েতে আসছেন, তাদের সাথে থাকা বাচ্চাদের গুঁড়ো দুধ, তরল ওষুধ এবং ব্যবহারের প্রসাধন সামগ্রী বহনে আন্তর্জাতিক তরল পদার্থের নিয়ম (LAGs Rule) প্রযোজ্য হয়।

৪. ব্যবসায়ী ও স্বর্ণালঙ্কার বহনকারী:
ছুটিতে দেশে যাওয়ার সময় বা ফেরার সময় প্রবাসীরা মা-বোনের জন্য অথবা ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসেবে স্বর্ণ নিয়ে যাতায়াত করেন। ব্যাগে অনুমোদিত সীমার বেশি স্বর্ণ বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আনা ইলেকট্রনিক্স পণ্য থাকলে এই নীতিমালা তাদের সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনে।

৫. সকল বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্সের যাত্রী:
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, কুয়েত এয়ারওয়েজ, জাজিরা এয়ারওয়েজ, ইউএস-বাংলা কিংবা ট্রানজিট এয়ারলাইন্স (যেমন এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, এয়ার অ্যারাবিয়া)—আপনি যে এয়ারলাইন্সেই ভ্রমণ করুন না কেন, কুয়েত কাস্টমস ও টার্মিনাল গ্রাউন্ডের নিয়ম সবার ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয়।

কুয়েত প্রবাসীদের জন্য এর প্রভাব ও করণীয়

কুয়েত বিমানবন্দরের ব্যাগেজ নিয়মে সামান্য একটি ভুল একজন প্রবাসীর পুরো জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর প্রভাব ব্যক্তিগত সম্মান, অর্থ এবং আইনি অস্তিত্বের সাথে জড়িত।

জীবনের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব:

  • অবৈধ মাদকের অভিযোগে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড: প্রবাসীরা অনেক সময় আত্মীয় বা প্রতিবেশীর অনুরোধে না বুঝে এক প্যাকেট ওষুধ বহন করেন। সেই প্যাকেটে যদি কুয়েতে নিষিদ্ধ কোনো নারকোটিক উপাদান থাকে, তবে কুয়েতি আইনে ‘না জেনে এনেছি’ এই যুক্তির কোনো আইনি গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আন্তর্জাতিক ড্রাগ ট্রাফিকিং আইনের আওতায় সরাসরি ফৌজদারি মামলা হয়, যার শাস্তি কয়েক বছরের জেল থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

  • ভারী আর্থিক জরিমানা ও মালামাল ধ্বংস: অতিরিক্ত ওজনের লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রতি কেজির জন্য এয়ারলাইন্সগুলো যে হারে অতিরিক্ত ফি (Excess Baggage Fee) আদায় করে, তাতে প্রবাসীর পকেটের বড় অংকের টাকা খসে যায়। অন্যদিকে কাস্টমসে খাবার নষ্ট ঘোষিত হলে প্রবাসীর কষ্টার্জিত টাকা এবং পরিবারের ভালোবাসা দুটোই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

  • ফ্লাইট মিস ও দেশে ফেরত পাঠানো: নিষিদ্ধ কোনো দ্রব্য পাওয়া গেলে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স হতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে কুয়েতে প্রবেশের অনুমতি স্থগিত হয়ে যেতে পারে এবং বিমানবন্দর থেকেই ফিরতি ফ্লাইটে দেশে পাঠিয়ে (Deport) দেওয়ার নজির অহরহ দেখা যায়।

প্রবাসীদের এই শুল্ক আইন ও বিমান ভ্রমণের বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে দেশের মূলধারার সংবাদপত্র প্রথম আলো (prothomalo.com)-এর প্রবাস পাতা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে থাকে।

কুয়েত প্রবাসীদের অবিলম্বে যা করা উচিত:

১. কারো কোনো পার্সেল বা প্যাকেট গ্রহণ না করা: প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় ও সোনালী নিয়ম হলো—বিমানবন্দরে কোনো পরিচিত, অপরিচিত বা কাছের বন্ধুর দেওয়া মুখবন্ধ প্যাকেট, মিষ্টির কার্টন বা ওষুধের পার্সেল নিজের ব্যাগে নেবেন না। ব্যাগে যা থাকবে, তার একশত ভাগ দায়ভার আইনত কেবল আপনার।
২. ওষুধের ক্ষেত্রে অরিজিনাল প্রেসক্রিপশন সাথে রাখা: আপনি যদি নিয়মিত কোনো প্রেসক্রিপশন ড্রাগ গ্রহণ করেন (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা থাইরয়েডের ওষুধ), তবে সেই ওষুধের আসল চিকিৎসাপত্র (ইংরেজি অনুবাদ ও সিলযুক্ত) সাথে রাখুন। ওষুধগুলো মূল ফ্যাক্টরি প্যাকেজিং বা ফয়েল পাতায় থাকতে হবে, খোলা কৌটায় কোনো ট্যাবলেট বহন করবেন না।
৩. লাগেজ ওজন করার ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার: বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই একটি ছোট ডিজিটাল হ্যান্ড-স্কেল দিয়ে প্রতিটি ব্যাগের ওজন মেপে নিন। টিকিটে যদি ২৩ কেজি লেখা থাকে, তবে ২২.৫ কেজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুন। বিমানবন্দরে দৌড়াদৌড়ি করে ব্যাগ খুলে কাপড় বের করার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো এতে সহজ হবে।
৪. স্বর্ণালঙ্কারের সঠিক ভাউচার: কুয়েত থেকে দেশে স্বর্ণ নেওয়ার সময় বা দেশ থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের অলংকার কুয়েতে আনার সময় ক্রয়ের রসিদ বা ভাউচার মানিব্যাগে রাখুন।

Step-by-Step কিভাবে করবেন / বিস্তারিত

বিমান ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া এবং কুয়েত বিমানবন্দরে কোনো ধরণের ঝামেলা ছাড়া দ্রুত কাস্টমস পার হওয়ার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:

ধাপ ১: চেকলিস্ট তৈরি ও লাগেজ নির্বাচন

  • ভ্রমণের অন্তত তিন দিন আগে কী কী মালামাল নেবেন তার একটি তালিকা তৈরি করুন।

  • একটি শক্ত, মজবুত এবং চাকাযুক্ত স্ট্যান্ডার্ড ট্রাভেল ট্রলি ব্যাগ ব্যবহার করুন।

  • কোনো দড়ি, সুতলি বা অমসৃণ কার্টন ব্যবহার করবেন না। ব্যাগের বাইরে একটি ট্যাগ বা স্টিকারে আপনার পুরো নাম, সিভিল আইডি নম্বর, কুয়েতের মোবাইল নম্বর এবং ঠিকানা স্পষ্টভাবে লিখে সেঁটে দিন।

ধাপ ২: খাদ্যদ্রব্য ও মসলা প্যাক করার আন্তর্জাতিক নিয়ম

  • দেশি মসলা (হলুদ, মরিচ, ধনিয়া) নিতে চাইলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বাজার থেকে কিনে পলিথিনে ভরবেন না। নামী ব্র্যান্ডের ফ্যাক্টরি সিলযুক্ত প্যাকেট ব্যবহার করুন।

  • মাছ বা শুঁটকি নিতে হলে তা সম্পূর্ণ গন্ধহীন ও শক্ত প্লাস্টিক এয়ারটাইট বক্সে ভ্যাকুয়াম প্যাক করে তারপর ব্যাগের মাঝখানে রাখুন।

  • কোনো ধরণের কাঁচা মাংস, শূকরের মাংসজাতীয় উপাদান বা পচনশীল দুগ্ধজাত খাদ্য ব্যাগে ঢোকাবেন না।

  • আচার বা তরল খাবার নিতে চাইলে কাঁচের বোতল সম্পূর্ণ পরিহার করুন। প্লাস্টিকের শক্ত কন্টেইনারে টেপ মেরে ব্যাগে এমনভাবে রাখুন যেন চাপে ফেটে জামাকাপড় নষ্ট না হয়।

ধাপ ৩: প্রেসক্রিপশন ও বৈধ ওষুধ গোছানোর পদ্ধতি

  • চিকিৎসকের আসল ব্যবস্থাপত্র (Prescription) সাথে নিন। ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকের নাম, বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং হাসপাতালের সিল থাকতে হবে।

  • আপনি কুয়েতে যতদিনের জন্য যাচ্ছেন বা যত মাসের জন্য যাচ্ছেন, সর্বোচ্চ সেই মেয়াদের সমপরিমাণ ওষুধ সাথে রাখতে পারবেন (সাধারণত সর্বোচ্চ ৩ মাসের বেশি ওষুধ নেওয়ার অনুমতি নেই)।

  • ওষুধগুলো হ্যান্ডব্যাগে না রেখে চেক-ইন ব্যাগেজে রাখাই নিরাপদ, তবে প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ (যেমন ইনহেলার বা প্রেসারের বড়ি) ফ্লাইটের সময়ের জন্য প্রেসক্রিপশনসহ হ্যান্ডব্যাগে রাখুন।

ধাপ ৪: হ্যান্ডব্যাগ বা কেবিন ব্যাগের প্রস্তুতি (৭ কেজির নিয়ম)

  • এয়ারলাইন্স ভেদে কেবিন ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন সাধারণত ৭ কেজি।

  • তরল পদার্থ বহনের আন্তর্জাতিক নিয়ম (LAGs Rule) মানুন: ১০০ মিলিমিটারের বেশি আয়তনের কোনো তরল, জেল, পারফিউম বা লোশন হ্যান্ডব্যাগে নেওয়া যাবে না। যা নেবেন তা একটি স্বচ্ছ ১ লিটারের জিপলক ব্যাগে রাখতে হবে।

  • ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংক, চার্জার, পাসপোর্ট, সিভিল আইডি এবং প্রয়োজনীয় জরুরি নথি সবসময় হ্যান্ডব্যাগে নিজের হেফাজতে রাখুন।

ধাপ ৫: কুয়েত বিমানবন্দরে কাস্টমস তল্লাশি ও চ্যানেল নির্বাচন

  • লাগেজ বেল্ট থেকে মালামাল সংগ্রহ করার পর শান্ত থাকুন। কোনো তাড়াহুড়ো করবেন না।

  • যদি আপনার ব্যাগে এমন কিছু থাকে যা শুল্ক পরিশোধযোগ্য বা ঘোষণা দেওয়ার মতো (যেমন অতিরিক্ত স্বর্ণ বা প্রচুর অর্থ), তবে লাল চ্যানেল (Red Channel) দিয়ে গিয়ে অফিসারের কাছে ডিক্লেয়ার করুন।

  • যদি কোনো নিষিদ্ধ সামগ্রী না থাকে, তবে সবুজ চ্যানেল (Green Channel) দিয়ে এক্স-রে স্ক্যানারের দিকে এগিয়ে যান।

  • কাস্টমস অফিসার যদি ব্যাগ খুলতে বলেন, হাসিমুখে সহযোগিতা করুন। কোনো প্রকার অসৌজন্যমূলক আচরণ বা তর্কে জড়াবেন না। কোনো খাবার বা জিনিস তারা ফেলে দিতে বললে বিনয়ের সাথে মেনে নিন, কারণ এটি তাদের দেশের সার্বভৌম আইন।

সাধারণ ভুল ও জটিলতা এড়াতে সতর্কতা

বিমান ভ্রমণের সময় প্রবাসীদের করা সাধারণ কিছু অসাবধানতা বড় ধরণের বিপদের সৃষ্টি করে। নিচে উল্লেখিত সতর্কতাগুলো সবসময় মনে রাখবেন:

১. পান, সুপারি ও জর্দার অতিরিক্ত আসক্তি পরিহার:
অনেক প্রবাসী দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে পান পাতা, কাঁচা সুপারি এবং জর্দার কৌটা নিয়ে আসেন বন্ধুদের উপহার দেওয়ার জন্য বা কুয়েতে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে। মনে রাখবেন, কুয়েত কাস্টমস বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আনা কোনো কৃষি পণ্য ছাড়পত্র ছাড়া দেশে ঢুকতে দেয় না। অধিক পরিমাণ পান-সুপারি পেলে কাস্টমস সরাসরি তা সিজ করে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।

২. কাউকে সাহায্য করতে গিয়ে অন্যের ব্যাগ নিজের নামে বুকিং না করা:
বিমানবন্দরের চেক-ইন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকার সময় প্রায়ই দেখা যায় কোনো সহযাত্রী এসে অনুনয়-বিনয় করছেন—"ভাই, আমার ব্যাগের ওজন বেশি হয়ে গেছে, আপনার ব্যাগে তো ওজন খালি আছে, আমার এই ছোট ব্যাগটা আপনার নামে একটু বুকিং দিয়ে দেন।" এই অনুরোধটি সাক্ষাৎ বিষপান করার সমান! ওই ব্যাগের ভেতর যদি সোনা, অবৈধ ওষুধ বা কোনো বিস্ফোরক থাকে, তবে পুলিশ কিন্তু আপনাকে হাতকড়া পরাবে, ওই সহযাত্রীকে নয়। স্পষ্ট ভাষায় মুখের ওপর বিনয়ের সাথে ‘না’ বলুন।

৩. নকল ব্র্যান্ডের সামগ্রী বা পাইরেটেড সফটওয়্যার:
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (IPR) আইন কার্যকর রয়েছে। বাণিজ্যিক পরিমাণে উচ্চ ব্র্যান্ডের নকল জুতো, ঘড়ি বা ব্যাগ আনলে তা চোরাচালান বিরোধী আইনে বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

৪. এয়ারপোর্টের ভেতরে স্পর্শকাতর ছবি বা ভিডিও ধারণ সম্পূর্ণ নিষেধ:
কুয়েত বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন ডেস্ক, কাস্টমস চেকিং এরিয়া বা পুলিশ অফিসারের কোনো ছবি বা টিকটক ভিডিও তুলবেন না। এটি কুয়েতের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও সাইবার সিকিউরিটি আইনে গুরুতর অপরাধ। ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক মোবাইল জব্দ এবং মামলা হতে পারে।

৫. ব্যাগেজ নষ্ট বা নিখোঁজ হলে করণীয়:
যদি কুয়েত বিমানবন্দরে নেমে দেখেন আপনার ব্যাগের তালা ভাঙা, জিনিসপত্র চুরি গেছে অথবা লাগেজ আসেনি, তবে কাস্টমস এরিয়া ত্যাগ করার আগেই এয়ারলাইন্সের ‘Lost and Found’ ডেস্কে যান। সেখানে আপনার ব্যাগেজ ট্যাগের রসিদ দেখিয়ে 'Property Irregularity Report' (PIR) ফর্ম পূরণ করুন। একবার বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে গেলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ আর কোনো দায়ভার গ্রহণ করে না।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে যাওয়ার সময় কতটুকু স্বর্ণালঙ্কার সাথে নেওয়া যায় এবং ট্যাক্স দিতে হয় কি?
উত্তর: কুয়েত কাস্টমসের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, নারীরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য যুক্তিসঙ্গত পরিমাণের স্বর্ণালঙ্কার (সাধারণত ব্যক্তিগত গহনা হিসেবে পরিহিত বা ব্যাগে থাকা) কোনো শুল্ক ছাড়াই বহন করতে পারেন। তবে স্বর্ণের বার, কয়েন বা অস্বাভাবিক পরিমাণে নতুন অলংকার থাকলে তা বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে গণ্য হবে এবং তার ওপর কাস্টমস শুল্ক প্রযোজ্য হবে। এছাড়া মোট স্বর্ণ ও নগদ অর্থের মূল্যমান ৩,০০০ কুয়েতি দিনারের বেশি হলে অবশ্যই বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কাস্টমসে ডিক্লারেশন দিতে হবে।

২. প্রেসক্রিপশন ছাড়া সাধারণ নাপা, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাগে নিলে কি সমস্যা হবে?
উত্তর: সাধারণ প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড বা গ্যাস্ট্রিকের ওমিপ্রাজল জাতীয় ওষুধ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এক বা দুই পাতা নিলে সাধারণত বড় কোনো জটিলতা হয় না। তবে অ্যান্টিবায়োটিক বা যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রেসক্রিপশন ড্রাগ বহনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের আসল ব্যবস্থাপত্র থাকা বাধ্যতামূলক। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো খোলা ট্যাবলেট বা অতিরিক্ত পরিমাণ ওষুধ ব্যাগে পেলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তা সরাসরি বাজেয়াপ্ত করতে পারে।

৩. দেশ থেকে রান্না করা খাবার, মাংসের তরকারি বা মিষ্টি বিমানে নিয়ে যাওয়ার নিয়ম কী?
উত্তর: রান্না করা মাংস, বিশেষ করে ঝোল জাতীয় তরকারি বিমানে বহন করা আন্তর্জাতিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। বিমানের কেবিনের অভ্যন্তরীণ চাপে এই তরল কন্টেইনার ফুটে গিয়ে ব্যাগ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মিষ্টি বা শুকনো মিষ্টি জাতীয় খাবার শক্ত ফুড-গ্রেড প্লাস্টিকের এয়ারটাইট বক্সে নিলে কাস্টমস সাধারণত কোনো বাধা দেয় না, তবে তা অবশ্যই ব্যক্তিগত ব্যবহারের মতো সীমিত পরিমাণে হতে হবে।


ডিসক্লেইমার: তথ্যটি Kuwait General Administration of Customs (customs.gov.kw) ও বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আপডেট। দেশ ও এয়ারলাইন্স ভেদে ব্যাগেজ এবং শুল্ক নীতিমালা পরিবর্তনশীল। ভ্রমণের পূর্বে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের অফিশিয়াল ব্যাগেজ পলিসি পুনরায় দেখে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

লেখক: Yasin Sarfuddin

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!