বিমানে যখন পাইলট ঘোষণা করেন, "সম্মানিত যাত্রীগণ, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছি"—তখন প্রতিটি প্রবাসীর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আবেগ আর শিহরণ খেলে যায়। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, মরুভূমির উত্তপ্ত বালুঝড় আর রাতের পর রাত ওভারটাইমের হাড়ভাঙা খাটুনি যেন নিমেষেই উবে যায়। জানালা দিয়ে নিচে সবুজ শ্যামল মাটির রূপ দেখে চোখে জল চলে আসে। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর নিজের দেশ, নিজের মাটি, নিজের পরিবারকে কাছে পাওয়ার সেই পবিত্র অনুভূতির কোনো তুলনা হয় না।
কিন্তু এই গভীর আনন্দের রেশটুকু ঠিক কতক্ষণ স্থায়ী হয়?
তিক্ত হলেও সত্যি, বিমানটির চাকা মাটি স্পর্শ করার পর প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে পা রাখা মাত্রই অধিকাংশ প্রবাসীর সেই সুখস্মৃতি নিমেষেই এক চাপা আতঙ্কে রূপ নেয়। দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের পর ক্লান্ত শরীরে ইমিগ্রেশনের ধীরগতির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কনভেয়ার বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভাঙা লাগেজ বা খোয়া যাওয়া মালামালের জন্য অপেক্ষা করা, আর পুরো টার্মিনাল ঘুরেও একটা খালি ট্রলি না পাওয়ার মতো দুঃসহ অভিজ্ঞতা আমাদের প্রায় সবার জীবনেই ঘটেছে। তার ওপর যোগ হয় কিছু অসাধু কর্মচারীর দুর্ব্যবহার এবং অযাচিত তল্লাশির ভোগান্তি। যাদের ঘামে ভেজা উপার্জনে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, সেই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা দেশের মাটিতে নেমেই প্রথম যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তা চরম বিশৃঙ্খলা আর আত্মমর্যাদাহানির।
আমি নিজে যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে কুয়েতে থাকি, তাই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি শ্রমজীবী ভাইয়ের মনের এই চাপা ক্ষোভ ও হাহাকার আমি খুব কাছ থেকে অনুভব করি। কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া কিংবা ওমান—যেখানেই আমরা থাকি না কেন, ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি বিমানবন্দরের এই চরম অব্যবস্থাপনার ভয় আমাদের সবার মনেই তাড়া করে ফেরে।
কিন্তু এসব ভোগান্তির পর আমরা সাধারণত কী করি?
হয়তো মেসের বন্ধুদের কাছে এসে রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ি, নয়তো নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক ওয়ালে বা কোনো গ্রুপে একটা ক্ষোভের পোস্ট বা ভিডিও দিয়ে মনের জ্বালা মেটানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সেই বিচ্ছিন্ন পোস্টগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার বিশাল অ্যালগরিদমে এক-দুই দিন পর হারিয়ে যায়। সরকারের নীতি-নির্ধারক কিংবা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের চোখে সেগুলো কখনোই সুসংগঠিতভাবে পৌঁছায় না। ফলে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি প্রবাসী একই ভোগান্তির শিকার হতে থাকেন, অথচ কোনো স্থায়ী সমাধান আসে না।
ঠিক এই জায়গাটাতেই সম্প্রতি আমার চোখে পড়ল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও আশা জাগানিয়া একটি প্ল্যাটফর্ম—AmarAirport.com
প্রথমে সাইটটির নাম দেখে আমার মনে হয়েছিল এটি হয়তো কোনো বাণিজ্যিক ট্রাভেল এজেন্সি বা বাণিজ্যিক সেবাদানকারী সাইট। কিন্তু ভালো করে জানার পর একজন সাধারণ প্রবাসী হিসেবে আমার চোখ কপালে উঠল। আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি উদ্যোগটির দর্শন দেখে। এটি কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, কোনো পেইড সার্ভিস নয় এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ছিটেফোঁটাও নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি অলাভজনক ও ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবামূলক নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, যা তৈরি করা হয়েছে শুধুমাত্র প্রবাসীদের কণ্ঠস্বরকে একত্রিত করার এক মহৎ লক্ষ্য নিয়ে।
AmarAirport.com মূলত এমন একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে যেকোনো প্রবাসী বা সাধারণ আকাশযাত্রী বাংলাদেশের যেকোনো বিমানবন্দরে নিজের ভালো-মন্দ বাস্তব অভিজ্ঞতা সবার সামনে সরাসরি তুলে ধরতে পারবেন। আপনার সাথে বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল—তা আপনি লিখে প্রকাশ করতে পারেন, এবং আপনার নিজের সোশ্যাল মিডিয়ার (ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক) ভিডিওর লিংক সরাসরি সেই লেখার সাথেই শেয়ার করে দিতে পারেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে—এতে আমাদের প্রবাসীদের কী লাভ হবে?
লাভটা এখানেই, আর এটাই এই প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা যখন একা একা নিজের ওয়ালে কোনো ভিডিও বা পোস্ট দিই, প্রশাসন খুব সহজেই সেটিকে "একজনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা" বলে এড়িয়ে যায়। কিন্তু যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শত শত প্রবাসী এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী একটি একক ও সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে একই বিষয়ের ওপর তথ্য-প্রমাণ সহ মতামত ও অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করবেন, তখন সেটিকে আর এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।
সব অভিযোগ, পরামর্শ ও প্রশংসার যখন একটি কেন্দ্রীয় পাবলিক আর্কাইভ বা তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারক, গণমাধ্যম এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB)-এর নজরে পড়তে বাধ্য হবে। সরকার তখন খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে ঠিক কোন টার্মিনালে, কোন শিফটে বা কোন সেক্টরে প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মুখে পড়ছেন। আর এই সম্মিলিত জনমতের চাপেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দ্রুততম সময়ে সমস্যা সমাধানের বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে বাধ্য হবে। এমন এক ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা থেকেই সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে এই সাইটটির যাত্রা শুরু হয়েছে।
এখানে আরেকটি সুন্দর দিক রয়েছে। এটি শুধু অভিযোগ করার জায়গা নয়; বিমানবন্দরে যদি কোনো কর্মকর্তা বা স্টাফ আপনার সাথে অত্যন্ত চমৎকার ও সম্মানজনক আচরণ করেন, তবে আপনি তাঁর নাম উল্লেখ করে প্রশংসাও করতে পারেন। এর ফলে ভালো কাজ করা মানুষগুলো উৎসাহিত হবেন এবং বাকিরাও প্রবাসীদের সম্মান দিতে শিখবেন।
কুয়েত, কাতার, দুবাই, রিয়াদ, কুয়ালালামপুর কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা—যেখানেই আপনি থাকুন না কেন, আপনার কাছে এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করার প্রক্রিয়াটি একেবারেই সহজ। আপনার স্মার্টফোনের ব্রাউজার থেকে সরাসরি AmarAirport.com-এ প্রবেশ করলেই একটি পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারবান্ধব পেজ দেখতে পাবেন। সেখানে গিয়ে খুব সহজে আপনি আপনার সাম্প্রতিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখে দিতে পারেন, নিজের করা ভিডিও বা ফেসবুক রিলসের লিংকটি বসিয়ে দিতে পারেন। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও ফ্রি।
একতাই বল—এই চিরন্তন সত্যটি আমরা প্রবাসীরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন প্রমাণ করি। তবে এবার সময় এসেছে নিজেদের অধিকার আর আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য এক হওয়ার। আমাদের পাঠানো প্রতিটি ডলার আর দিনারের প্রতিটি পয়সায় দেশের চাকা ঘোরে। তাই দেশের বিমানবন্দরে মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে হাঁটার অধিকার আমাদের সবার রয়েছে।
পরের বার যখন দেশে যাবেন বা দেশ থেকে প্রবাসে ফিরবেন, আপনার ভালো কিংবা খারাপ অভিজ্ঞতা শুধু মনের ভেতর চেপে রাখবেন না বা বিচ্ছিন্নভাবে নষ্ট হতে দেবেন না। সরাসরি AmarAirport.com-এ গিয়ে আপনার সত্য অভিজ্ঞতাটি লিখে দিয়ে আসুন। আপনি হয়তো একা একটি পোস্ট করছেন, কিন্তু আপনার এই একটি সত্য লেখাই আরও দশ হাজার প্রবাসীর কণ্ঠের সাথে মিলে আমাদের দেশের বিমানবন্দরগুলোর চেহারা চিরতরে বদলে দেওয়ার মতো একটি বড় সংস্কারের সূচনা করতে পারে। এই ভলান্টিয়ার উদ্যোগটির কথা আপনার পরিচিত প্রতিটি প্রবাসী ভাইয়ের সাথে শেয়ার করুন—কারণ এটি আমাদেরই প্ল্যাটফর্ম, আমাদেরই অধিকারের লড়াই।
লেখক: Yasin Sarfuddin