লিওনেল মেসির বিদায়লগ্নের রূপকথা: এক প্রজন্মের আবেগের ইতিবৃত্ত

0

 

বিদায় নেওয়ার দিনেও মাঠের শ্রেষ্ঠ শিল্পী: লিওনেল মেসি এবং আমাদের এক জীবনের রূপকথা



খেলাধুলার ইতিহাসে বিদায় সবসময়ই এক বিষাদময় অধ্যায়। যেকোনো খেলার কিংবদন্তিদের বিদায়লগ্নের দিকে তাকালে সাধারণ একটা দৃশ্যপট চোখে পড়ে—পায়ের গতি কমে এসেছে, রিফ্লেক্স দুর্বল হয়ে গেছে, চোখের সামনে তরুণ তুর্কিরা তাকে অনায়াসে পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছে, আর গ্যালারির মানুষ এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মেনে নিচ্ছে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে। বিদায় মানেই যেন কিছুটা করুণা, বিদায় মানেই যেন কোনোমতে মাঠের শেষ প্রান্ত থেকে সম্মানজনক প্রস্থান।

কিন্তু ফুটবলের ব্যাকরণ যার পায়ের জাদুতে বারবার নতুন করে লেখা হয়েছে, সেই লিওনেল আন্দ্রেস মেসির জন্য বিদায়ের স্ক্রিপ্টটাও অন্য সবার মতো সাধারণ হবে—এমনটা ভাবা সম্ভবত বোকামি।

একবার চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটি কল্পনা করুন। একজন মানুষ তাঁর জাতীয় দলের হয়ে নিজের শেষ অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছেন। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে যেখানে যেকোনো ফুটবলার নিজেকে কেবল প্রতীকী একজন সিনিয়র খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে উপস্থিত রাখেন, সেখানে এই মানুষটি পুরো নব্বই মিনিট ধরে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে খেলনা বানিয়ে ছাড়লেন!

বিদায়ের ক্ষণেও তাঁর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়—একটি অসাধারণ গোল, নিখুঁত দুটি অ্যাসিস্ট, অসংখ্য ড্রিবলিং, প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে আদায় করা ফ্রিকিক, আর দীর্ঘদিনের সতীর্থ নিকোলাস ওটামেন্দির জন্য নিখুঁত বল সাজিয়ে দিয়ে তাকেও ইতিহাসের অংশ বানিয়ে দেওয়া। ম্যাচের শেষে যখন স্কোরবোর্ডের পাশে তাঁর ব্যক্তিগত রেটিং ভেসে উঠল, তখন সেখানে লেখা ৯-এর ওপর এক অতিমানবীয় স্কোর!

বিদায় নেওয়ার দিনেও মাঠের সবচেয়ে ইমপ্যাক্টফুল, সবচেয়ে বিধ্বংসী এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হয়ে থাকা—এটি কি কেবল ফুটবল? না, এটি নিখাদ এক শিল্প। এমন শিল্প, যার কোনো পুনরাবৃত্তি এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়বার ঘটবে না।

সেই আকাশী-সাদা জার্সির আজন্ম দায়

অনেকে বলেন, কিছু মানুষের জন্ম হয় কোনো নির্দিষ্ট পতাকাকে বিশ্বের বুকে গৌরবের সাথে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য। লিওনেল মেসির জন্ম যেন হয়েছিল এই আকাশী-সাদা আর্জেন্টিনার জার্সিটার জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার জন্য।

অথচ এই জার্সির ইতিহাস তাঁর জন্য সবসময় মধুর ছিল না। ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় জুড়ে এই মানুষটিকে সহ্য করতে হয়েছে নির্মম সমালোচনা, ট্রল আর অপবাদ। তাকে শুনতে হয়েছে তিনি নাকি বার্সেলোনার হয়ে যতটা উজাড় করে দেন, দেশের হয়ে ততটা দেন না। ২০১৬ সালের সেই নিউ জার্সির ফাইনালের পর মাঠের ঘাসে বসে যখন তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন এবং এক বুক অভিমান নিয়ে বলে ফেলেছিলেন, "আমার জন্য জাতীয় দল আর নয়"—তখন মনে হয়েছিল এই প্রেমের গল্পটা হয়তো এক ট্র্যাজেডি হয়েই শেষ হবে।

কিন্তু নিয়তি যার জন্য মহাকাব্য লিখে রেখেছিল, সে তো এভাবে হার মানতে পারে না। মেসি ফিরে এসেছিলেন। শুধু নিজের জন্য নয়, ফিরে এসেছিলেন তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখা কোটি কোটি সমর্থকের জন্য। এরপর যা ঘটেছে, তা আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর রূপকথা। মারাকানার বুকে কোপা আমেরিকা জয়, ফিনালিসিমায় ইতালিকে উড়িয়ে দেওয়া, আর সবশেষে ২০২২ সালের কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই অমর রাত—যেখানে ফুটবলের সমস্ত আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিয়ে তিনি পুরো বিশ্বকে বাধ্য করেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের সামনে মাথা নত করতে। তিনি আকাশী-সাদা জার্সিটাকে এক টুকরো কাপড়ের চেয়ে অনেক বড় কিছু বানিয়ে তুলেছিলেন; বানিয়েছিলেন এক অদম্য আবেগের প্রতীক।

সিংহাসন ছেড়ে নতুনদের উপহার দেওয়ার মহত্ত্ব

আজ মেসি যে শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় আছেন, বাস্তবতার চোখে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়—অন্য যেকোনো খেলোয়াড় হলে এই ফর্ম নিয়ে অনায়াসে আরও দুই থেকে তিন বছর আন্তর্জাতিক ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাজত্ব করে যেতে পারতেন। এখনো বল তাঁর পায়ে গেলে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডাররা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন, এখনো তাঁর একেকটি ডিফেন্স-চেরা পাস দেখে গ্যালারি স্তব্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু এখানেই সাধারণ খেলোয়াড়দের সাথে মহাতারকার পার্থক্য। মেসি জানেন কখন থামতে হয়। তিনি সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি সিংহাসন আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য খেলেন না; বরং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি সেই সিংহাসন তুলে দিয়ে যাচ্ছেন হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার আর আলেহান্দ্রো গারনাচোদের মতো নতুন প্রজন্মের হাতে। বিদায়লগ্নেও নিজেকে সর্বেসর্বা না ভেবে দলের প্রতিটি সদস্যকে ভালো খেলার মঞ্চ বানিয়ে দেওয়া—এ এক অন্য স্তরের উদারতা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের গভর্নিং বডি আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (FIFA)-এর নথিতে হয়তো মেসির গোল আর ট্রফির সংখ্যা চিরকাল খোদাই করা থাকবে, কিন্তু মাঠের ভেতরের এই আত্মত্যাগ ও লিডারশিপ কোনো পরিসংখ্যানের পাতায় বন্দি করা সম্ভব নয়।

রাত জাগা এক প্রজন্মের অমলিন ঋণ

আমাদের এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, সৌদি আরব, দুবাই বা কাতারের মরুভূমির মেসগুলোতে যারা বসবাস করেন—তাদের জীবনের সাথে মেসির সম্পর্কটা একদম রক্তের মতো।

একটু ভেবে দেখুন, গত বিশ বছর ধরে আমরা কতশত রাত জেগেছি শুধু এই মানুষটার খেলা দেখব বলে! পরদিন সকালে কুয়েতের শুয়েখে ভারী কাজের শিফট, কিংবা দেশে স্কুল-কলেজ বা অফিসের তাড়া—কোনো কিছুই আমাদের আটকাতে পারেনি। রাত দুটো বা তিনটের সময় টিভির পর্দা বা ভাঙা ল্যাপটপের সামনে বসে আমরা অপেক্ষা করেছি তাঁর পায়ের একটু জাদুর জন্য।

সেই ম্যাচগুলোর অনেকগুলোতে হয়তো দল হিসেবে আর্জেন্টিনা জিততে পারেনি। বহুবার হৃদয় ভেঙেছে, বহু সকাল কেটেছে বিষণ্ণতায়। কিন্তু একটি কথা বুকে হাত দিয়ে বলা যায়—মেসির খেলা দেখে আমরা কখনোই নিরাশ হইনি। দল হেরে যাওয়ার দিনেও যখন মানুষটি একা চার-পাঁচজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে বল নিয়ে এগিয়ে গেছেন, গোলবারে শট নিয়েছেন, তখন প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী বুঝতে পেরেছে মাঠে যা ঘটছিল তা হার-জিতের চেয়েও মহত্তর কিছু ছিল। তিনি ফুটবলের প্রতিটি স্পর্শকে নান্দনিক আনন্দে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের শৈশব, আমাদের কৈশোর আর আমাদের যৌবনের সাথে এমনভাবে মিশে গেছেন যে, তাঁর বিদায়ের সাথে সাথে যেন আমাদের জীবনের একটি বড় সোনালী অধ্যায়েরও পরিসমাপ্তি ঘটে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল কিংবদন্তিদের এই সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলা বিভিন্ন সময়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যায় মেসির মতো ক্রীড়াবিদরা কীভাবে কোনো একক দেশের সীমানা পেরিয়ে পুরো বিশ্বের সার্বজনীন সম্পদে পরিণত হয়েছেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা যে গল্প শোনাব

সময় বয়ে যাবে, ফুটবলে নতুন নতুন তারকা আসবেন। এমবাপ্পে, হালান্ড কিংবা ইয়ামালরা হয়তো গোলসংখ্যার নতুন কোনো রেকর্ড গড়বেন, হয়তো ট্রফির সংখ্যাও বাড়িয়ে নেবেন। কিন্তু আজকের এই প্রজন্মের মানুষ যখন বৃদ্ধ হবে, তখন তাদের কাছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বলার মতো একটি অসাধারণ গল্প থাকবে।

আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বুক ফুলিয়ে বলব—"তোমরা হয়তো ইতিহাসের পাতায় অনেক বড় বড় খেলোয়াড়ের নাম পড়বে, কিন্তু আমরা নিজেদের চোখে এমন একজনকে জীবন্ত খেলতে দেখেছি, যার নাম ছিল লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। সে কেবল একজন ফুটবলার ছিল না, সে ছিল আমাদের গভীরতম আবেগ।"

আমরা তাদের বলব, আমরা এমন এক জাদুকরকে দেখেছিলাম, যে বল নিয়ে দৌড়ালে সময় যেন থমকে যেত। যে বিপক্ষের হিংস্র ট্যাকল খেয়েও মাটিতে পড়ে থাকার চেয়ে বল নিয়ে উঠে দাঁড়ানোকে বেশি ভালোবাসত। আর যে নিজের বিদায়ের শেষ ক্ষণেও এক গোল আর দুই অ্যাসিস্ট করে ৯-এর ওপর রেটিং রেখে হাসিমুখে রাজার মতো মাঠ ছেড়েছিল।

মেসি ফুটবলকে বিদায় বললেও, ফুটবল কখনো মেসিকে বিদায় বলতে পারবে না। সবুজ ঘাসের প্রতিটি কোণে, জাদুকরী প্রতিটি ড্রিবলিংয়ে আর বল জালে জড়ানোর অনাবিল সৌন্দর্যে এই মানুষটি অমর হয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

ধন্যবাদ লিওনেল মেসি, আমাদের রাতগুলোকে সার্থক করার জন্য। ধন্যবাদ, ফুটবলকে এক পরম শিল্পের রূপ দিয়ে আমাদের জীবনটাকে এতো সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়ার জন্য।

লেখক: Nur Afser

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!