কুয়েতের শুয়েখ শিল্পাঞ্চলের একটি অটোমোবাইল পার্টসের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করেন নোয়াখালীর মফিজুর রহমান। টানা দশ বছর ধরে এই শহরে আছেন তিনি। কিছুদিন আগে এক গভীর রাতে হঠাৎ তীব্র পেটের ব্যথা আর কাঁপুনি দিয়ে প্রচণ্ড জ্বর শুরু হয় তার। ব্যথায় ছটফট করতে করতে ভোররাতে এক সহকর্মীর ট্যাক্সি ডেকে তিনি ছুটে যান নিকটস্থ ফারওয়ানিয়া সরকারি জেনারেল হাসপাতালে। মফিজুর জানতেন, সিভিল আইডি দেখালে হয়তো নামমাত্র দুই দিনার টিকিট কেটে জরুরি চিকিৎসা পাওয়া যাবে, যেমনটা তিনি অতীতে পেয়েছেন।কিন্তু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি রিসেপশনের কাউন্টারে সিভিল আইডি জমা দিতেই সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মী তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, "আপনি প্রাইভেট সেক্টরের (আর্টিকেল ১৮) কর্মী। আপনার এলাকার জন্য এখন আর সাধারণ সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ খোলা নেই। আপনার আকামার অধীনে স্বাস্থ্যসেবা এখন ‘ধামান’ (Dhaman) হেলথ নেটওয়ার্কের অধীনে চলে গেছে। আপনাকে দাজিজ এলাকার ধামান প্রাইমারি হেলথ সেন্টারে যেতে হবে অথবা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিলে নতুন বর্ধিত ফি এবং ওষুধের জন্য আলাদা প্রেসক্রিপশন চার্জ পরিশোধ করতে হবে।"
অসহ্য ব্যথার মধ্যে এমন অচেনা নিয়মের মুখে পড়ে মফিজুর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। কুয়েতে সরকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় যে আমূল পরিবর্তন এনেছে এবং প্রবাসীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল ও ক্লিনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, সে সম্পর্কে তার কোনো স্পষ্ট ধারণাই ছিল না। শেষ পর্যন্ত সহকর্মীর কাছ থেকে টাকা ধার করে তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
মফিজুরের এই অভিজ্ঞতা কুয়েতে বসবাসরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মরুভূমির এই দেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করতে গিয়ে প্রবাসীরা সবচেয়ে বড় যে ঝুঁকির মুখে পড়েন, তা হলো শারীরিক অসুস্থতা। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রবাসীদের স্বাস্থ্যবীমা (ধামান সিহি), সরকারি ক্লিনিকের সময়সূচি, ওষুধের মূল্য নির্ধারণ এবং বিশেষায়িত ধামান হাসপাতালের কার্যক্রম চালু নিয়ে ব্যাপক সংস্কার এনেছে। অসুস্থতার মুহূর্তে সঠিক নিয়মের অভাবে যেন কাউকে বিনা চিকিৎসায় বা আর্থিক বিপদে পড়তে না হয়, সেজন্য কুয়েতের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার নাড়িনক্ষত্র জানা প্রতিটি প্রবাসীর জন্যই অপরিহার্য।
কুয়েতে প্রবাসীদের স্বাস্থ্যবীমা ও ধামান সিস্টেম আসলে কি? নতুন আপডেট কি?
কুয়েতে বৈধভাবে বসবাসের জন্য প্রতিটি বিদেশি নাগরিককে প্রতি বছর আকামা নবায়নের সময় যে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবীমা ফি পরিশোধ করতে হয়, স্থানীয় পরিভাষায় তাকে ‘ধামান সিহি’ (Dhaman Sihi বা Health Assurance) বলা হয়। অতীতে এই বীমা ফি দেওয়ার পর প্রবাসীরা নিজ নিজ আবাসিক এলাকার সরকারি পলিক্লিনিক (মুস্তাসওয়াফ) এবং বড় সরকারি জেনারেল হাসপাতালগুলোতে কুয়েতি নাগরিকদের পাশাপাশি প্রায় বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সব ধরনের চিকিৎসা, রক্ত পরীক্ষা এবং ওষুধ পেতেন।
কিন্তু কুয়েতের সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর প্রবাসীদের অতিরিক্ত ভিড় কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কুয়েত সরকার পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের অধীনে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘হেলথ অ্যাসুরেন্স হসপিটালস কোম্পানি’, যা সংক্ষেপে ধামান (Dhaman / ضمان) নামে পরিচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে কার্যকর হওয়া নতুন চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবীমা আপডেটের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ধামান নেটওয়ার্কের কাছে প্রাইভেট সেক্টরের দায়িত্ব হস্তান্তর:
কুয়েতের নতুন স্বাস্থ্যনীতি অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে কর্মরত সাধারণ প্রবাসী (আর্টিকেল ১৮) এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারবর্গকে (আর্টিকেল ২২) ধীরে ধীরে সাধারণ সরকারি পলিক্লিনিক থেকে সরিয়ে ধামানের নিজস্ব প্রাইমারি হেলথকেয়ার সেন্টার ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর অধীনে নিয়ে আসা হচ্ছে। দাজিজ (ফরওয়ানিয়া), জাহরা, হাওয়াল্লি ও ফাহাহিল (আহমদি) এলাকায় ধামানের বিশাল আধুনিক মেডিকেল সেন্টারগুলো পুরোদমে চালু করা হয়েছে।
২. সরকারি হাসপাতালে ওষুধের ওপর আলাদা প্রেসক্রিপশন ফি:
পূর্বে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখালে টিকিটের মূল্যের ভেতরেই ওষুধ অন্তর্ভুক্ত থাকত। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনায় প্রবাসীদের জন্য ওষুধের ওপর আলাদা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। পলিক্লিনিকে ডাক্তার দেখানোর টিকিটের পাশাপাশি সরকারি ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিতে হলে অতিরিক্ত ৫ কুয়েতি দিনার এবং জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখালে ওষুধের জন্য ১০ কুয়েতি দিনার আলাদা ফি ধার্য করা হয়েছে।
৩. ক্লিনিক পরিদর্শনের সময়সূচিতে কড়াকড়ি:
কুয়েতের অধিকাংশ সরকারি পলিক্লিনিকে সকালের শিফটটি মূলত কুয়েতি নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। প্রবাসীদের সাধারণ চিকিৎসার জন্য বিকেল বা রাতের শিফটে যাওয়ার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে, যাতে সকালে কোনো ভিড় তৈরি না হয়। তবে তীব্র জরুরি বা ইমার্জেন্সি রোগীদের জন্য চব্বিশ ঘণ্টা সরকারি ক্যাজুয়ালটি খোলা থাকে।
৪. ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া চিকিৎসা না পাওয়া:
জরুরি দুর্ঘটনা ছাড়া সাধারণ জ্বর, সর্দি, পেটের সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদী রোগের ক্ষেত্রে সরাসরি গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর সুযোগ প্রায় বন্ধ। কুয়েতের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জন্য ‘সাহেল’ (Sahel) অ্যাপ অথবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে আগাম স্লট বুকিং করতে হয়। একইভাবে ধামান সেন্টারে যেতে হলেও তাদের নিজস্ব অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সর্বশেষ সরকারি সার্কুলার এবং ফি তালিকা যাচাই করতে সরাসরি কুয়েত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (MOH)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করা যেতে পারে।
কাদের জন্য প্রযোজ্য?
কুয়েতের পরিবর্তিত স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নীতিমালা দেশটির প্রায় সব বিদেশি নাগরিকের ওপর কার্যকর হলেও, বিভিন্ন ভিসা ক্যাটাগরির জন্য নিয়ম কিছুটা আলাদা:
১. আর্টিকেল ১৮ (প্রাইভেট সেক্টর ও কোম্পানি কর্মী):
কুয়েতে অবস্থানরত সিংহভাগ বাংলাদেশি ভাই-বোন এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন ফার্ম, ওয়ার্কশপ, সুপারমার্কেট, ক্লিনিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের জন্য ধামান সিস্টেমের নতুন নিয়মগুলো শতভাগ প্রযোজ্য। তাদের বাৎসরিক স্বাস্থ্যবীমা ফি কোম্পানির মাধ্যমে পরিশোধিত হতে হয় এবং তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার ঠিকানা নির্ধারিত ধামান ক্লিনিক।
২. আর্টিকেল ২২ (ফ্যামিলি বা ডিপেন্ডেন্ট ভিসা):
প্রবাসীদের স্ত্রী ও সন্তানরা যারা কুয়েতে বসবাস করছেন। তাদেরও স্পন্সরের অধীনে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবীমা প্রদান সাপেক্ষে একই নিয়মে নির্ধারিত পারিবারিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে হয়।
৩. আর্টিকেল ২০ (গৃহকর্মী ও ব্যক্তিগত চালক):
বাসাবাড়িতে কাজ করা খাদেম, তব্বাক (বাবুর্চি) ও ব্যক্তিগত ড্রাইভারদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয় হলো—তারা এখনো সরাসরি কুয়েত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের (MOH) অধীনস্থ স্থানীয় সরকারি মুস্তাসওয়াফ ও হাসপাতালগুলোতে স্বল্পমূল্যের পুরনো ফি কাঠামোতেই চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। তাদের জন্য ধামান বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
৪. আর্টিকেল ১৭ (সরকারি খাতের কর্মচারী):
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থায় কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা টেকনিশিয়ানরা সরকারি সিভিল সার্ভিসের আওতাধীন নির্ধারিত স্বাস্থ্য সুবিধার আওতায় চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
৫. ভিজিট ভিসায় আগত পরিবার:
স্বল্পমেয়াদী ফ্যামিলি বা ট্যুরিস্ট ভিসায় যারা কুয়েতে আসছেন, তাদের ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে যেকোনো চিকিৎসার জন্য পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ফি প্রযোজ্য। তাই দেশ থেকে আসার সময়ই তাদের জন্য কমপ্রিহেনসিভ প্রাইভেট ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স নিশ্চিত করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কুয়েত প্রবাসীদের জন্য এর প্রভাব ও করণীয়
কুয়েত সরকারের এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন দীর্ঘমেয়াদে সেবার মান বাড়ালেও, সাধারণ স্বল্প আয়ের প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবন ও বাজেটের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
আর্থিক জীবনে বিরূপ প্রভাব:
কুয়েতে একজন সাধারণ শ্রমিকের গড় বেতন যেখানে একশত থেকে একশত পঞ্চাশ দিনার, সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ডাক্তার দেখানো ও ওষুধের জন্য একবারে দশ-পনেরো দিনার খরচ হয়ে যাওয়া অনেক বড় একটি ধাক্কা। এর ফলে অনেক প্রবাসী অর্থ বাঁচানোর জন্য সামান্য অসুস্থতাকে চেপে রাখেন, ডাক্তারের কাছে না গিয়ে মেসের বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করা ব্যথানাশক ট্যাবলেট খেয়ে কাজ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে সেই সাধারণ রোগটি জটিল কিডনি বা হার্টের সমস্যায় রূপ নেয়, যা প্রবাসীর জীবনকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
কর্মক্ষেত্রে ছুটির জটিলতা (ইজাজা মারাদিয়া):
কোম্পানিতে কাজ করার সময় অসুস্থ হলে ছুটির জন্য ডাক্তারের অফিশিয়াল ‘সিক লিভ’ (Sick Leave সার্টিফিকেট) প্রয়োজন হয়। নতুন নিয়মে সরকার অনুমোদিত ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোনো ভুয়া প্যাডের ছুটি কোম্পানি গ্রহণ করে না। এছাড়া ডিজিটাল সাহেল অ্যাপের মাধ্যমে সিক লিভ ভেরিফাই না করালে অনেক অসাধু নিয়োগকর্তা কর্মীর বেতন কেটে রাখেন।
প্রবাসী জীবনের এই স্বাস্থ্যগত টানাপোড়েন ও নাগরিক সমস্যাগুলো নিয়ে নির্ভরযোগ্য এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে দেশের শীর্ষ জাতীয় গণমাধ্যম প্রথম আলো, যা প্রবাসীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা ও অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কুয়েত প্রবাসীদের জরুরি করণীয়:
১. নিজের নির্ধারিত ক্লিনিকের অবস্থান জেনে রাখা: অসুস্থ হওয়ার আগেই জেনে নিন আপনার সিভিল আইডিতে যে আবাসিক এলাকা উল্লেখ আছে, সেই এলাকার প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি মুস্তাসওয়াফ কোনটি এবং ধামান সেন্টারটি ঠিক কোথায় অবস্থিত। জরুরি মুহূর্তে যেন খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট না হয়।
২. দেশ থেকে অবাধে অনিবন্ধিত ওষুধ না আনা: অনেকে দেশ থেকে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া লাগেজে করে নিয়ে আসেন এবং মেসে জমিয়ে রাখেন। কুয়েতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ওষুধ সেবন করা যেমন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, তেমনি তল্লাশিতে অননুমোদিত ওষুধ ধরা পড়লে আইনি জটিলতা হতে পারে।
৩. আকামা নবায়নের স্বাস্থ্যবীমার রসিদ সংরক্ষণ: আপনার কোম্পানি বা কফিল যখন আকামা নবায়ন করে, তখন স্বাস্থ্যবীমা বাবদ সরকারি যে পেমেন্ট স্লিপটি বের হয়, সেটির একটি ডিজিটাল কপি নিজের ফোনে সেভ করে রাখুন। অনেক সময় ক্লিনিকে সার্ভার ডাউন থাকলে এই স্লিপ দেখালে চিকিৎসা পাওয়া সহজ হয়।
৪. দীর্ঘমেয়াদী রোগের আগাম ব্যবস্থা: যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা শ্বাসকষ্টের মতো ক্রনিক রোগ রয়েছে, তারা নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে সরকারি বা ধামান ক্লিনিক থেকে মাসিক প্রেসক্রিপশন করিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করুন। শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করবেন না।
Step-by-Step কিভাবে করবেন / বিস্তারিত
কুয়েতে অসুস্থ হলে কীভাবে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পাবেন এবং ওষুধ সংগ্রহ করবেন, তার পূর্ণাঙ্গ ধাপগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
ধাপ ১: স্বাস্থ্যবীমার (ধামান সিহি) স্ট্যাটাস যাচাই
আপনার আকামা সচল থাকা মানেই আপনার স্বাস্থ্যবীমা পরিশোধিত রয়েছে।
তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ‘Sahel’ অ্যাপ ওপেন করে ‘Ministry of Health’ অপশনে গিয়ে আপনার হেলথ ইন্স্যুরেন্সের মেয়াদের তারিখ দেখে নিন।
যদি মেয়াদ শেষ হয়ে থাকে, তবে কফিলকে দিয়ে অবিলম্বে তা রিনিউ করিয়ে নিতে হবে, অন্যথায় কোনো হাসপাতাল আপনার সিভিল আইডি গ্রহণ করবে না।
ধাপ ২: সিভিল আইডির ঠিকানা অনুযায়ী ক্লিনিক নির্ধারণ
কুয়েতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মুহাফাজা বা প্রশাসনিক অঞ্চলভিত্তিক পরিচালিত হয়।
আপনার সিভিল আইডি কার্ডের পেছনের অংশে যে এলাকার নাম (যেমন: ফরওয়ানিয়া, হাসাবি, মাহবুল্লা বা সালমিয়া) লেখা আছে, আপনি কেবল সেই নির্দিষ্ট এলাকার নির্ধারিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে পারবেন।
আপনি যদি আর্টিকেল ১৮-এর কর্মী হন এবং আপনার এলাকায় ধামান কার্যকর হয়ে থাকে, তবে নিকটস্থ ধামান প্রাইমারি সেন্টারে যেতে হবে। আর ধামান পুরোপুরি কার্যকর না হলে স্থানীয় সরকারি মুস্তাসওয়াফে যেতে হবে।
ধাপ ৩: অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং
স্মার্টফোনে সাহেল অ্যাপ অথবা ধামানের নিজস্ব বুকিং পোর্টাল ওপেন করুন।
আপনার সিভিল আইডি নম্বর দিন।
‘Book Clinic Appointment’ অপশনে গিয়ে সাধারণ চিকিৎসা (General Medicine), দন্ত বিভাগ (Dental) বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নির্বাচন করুন।
সুবিধাজনক তারিখ ও সময় বেছে নিয়ে কনফার্ম করুন। আপনার মোবাইলে একটি বুকিং বারকোডসহ মেসেজ আসবে।
ধাপ ৪: ক্লিনিকে উপস্থিতি ও ফি পরিশোধ
অ্যাপয়েন্টমেন্টের নির্ধারিত সময়ের অন্তত পনেরো মিনিট আগে ক্লিনিকে পৌঁছান।
রিসেপশনে আপনার মূল সিভিল আইডি কার্ড এবং বুকিং মেসেজ প্রদর্শন করুন।
সরকারি পলিক্লিনিক বা ধামান সেন্টারের নির্ধারিত কনসালটেশন ফি আপনার লোকাল ব্যাংক কার্ড (K-Net) দিয়ে পরিশোধ করুন। নগদ টাকার চেয়ে কার্ড পেমেন্ট এখানে বাধ্যতামূলক।
ডাক্তার আপনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর যদি কোনো এক্স-রে বা রক্তের টেস্ট দেন, তবে সেন্টারের নিজস্ব ল্যাবরেটরি থেকে তা করিয়ে নিন।
ধাপ ৫: ওষুধ সংগ্রহ ও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন
ডাক্তার কম্পিউটারে ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন তৈরি করে দেবেন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লিনিকের ফার্মেসিতে চলে যাবে।
ফার্মেসির কাউন্টারে গিয়ে টোকেন নিন এবং ওষুধের জন্য নির্ধারিত সরকারি স্ট্যাম্প বা ফি (কে-নেট দিয়ে) পরিশোধ করে সিলমোহরযুক্ত ওষুধ সংগ্রহ করুন।
ডাক্তার যদি কোনো বিশেষজ্ঞ বা বড় হাসপাতালে রেফার (Transfer Paper) করেন, তবে সেই রেফারেল পেপারটি সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট বড় জেনারেল হাসপাতালে নির্দিষ্ট তারিখে যেতে হবে।
সাধারণ ভুল ও জটিলতা এড়াতে সতর্কতা
কুয়েতে চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেসব সাধারণ ভুলের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন, সেগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক:
১. সিভিল আইডির ঠিকানার বাইরে অন্য অঞ্চলের ক্লিনিকে যাওয়া:
অনেকে সালমিয়ায় থাকেন কিন্তু সিভিল আইডিতে কোম্পানির পুরনো ঠিকানা হিসেবে হাসাবি বা জাহরা লেখা থাকে। মনে রাখবেন, কুয়েতের সরকারি স্বাস্থ্য সার্ভার সিভিল আইডির ঠিকানার বাইরে এক পা-ও নড়ে না। আপনি যদি অন্য এলাকার ক্লিনিকে যান, রিসেপশন কম্পিউটার আপনার ফাইল খুলতেই পারবে না এবং আপনাকে সরাসরি ফিরিয়ে দেবে। তাই আপনার বর্তমান ঠিকানার সাথে সিভিল আইডির ঠিকানা সবসময় আপডেট রাখুন।
২. জরুরি অবস্থা ও সাধারণ অসুস্থতার পার্থক্য না বোঝা:
যদি হঠাৎ মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দেয় বা কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে—তবে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা ধামান ক্লিনিকের প্রয়োজন নেই। সরাসরি কুয়েতের যেকোনো নিকটস্থ সরকারি জেনারেল হাসপাতালের ‘জরুরি বিভাগ’ (Emergency / Casualty)-এ চলে যাবেন অথবা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ১১২ (112) নম্বরে কল করবেন। জরুরি বিভাগে জীবন বাঁচানোকে সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
৩. মেসের হাতুড়ে ডাক্তার বা অননুমোদিত ওষুধ বিক্রেতাদের ফাঁদ:
কুয়েতের বিভিন্ন প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় কিছু অসাধু লোক রয়েছে যারা কোনো ডাক্তারি লাইসেন্স ছাড়াই রুমের ভেতর অবৈধ ক্লিনিক খুলে বসে এবং মেয়াদোত্তীর্ণ দেশি স্যালাইন বা ইনজেকশন পুশ করে। কুয়েতের গোয়েন্দা বিভাগ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব অবৈধ আস্তানায় নিয়মিত ঝটিকা অভিযান চালায়। এদের কাছে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ধরা পড়লে আইনি জটিলতা সহ ভুল চিকিৎসায় অঙ্গহানি বা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।
৪. কফিলের দেওয়া স্বাস্থ্যবীমার ভুয়া কাগুজে প্রতারণা:
কিছু নামসর্বস্ব কোম্পানি কর্মীদের কাছ থেকে ইন্স্যুরেন্সের টাকা কেটে রাখলেও মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় না। ক্লিনিকে যাওয়ার পর সার্ভারে যখন দেখা যায় স্বাস্থ্যবীমা নেই, তখন প্রবাসীরা বিপদে পড়েন। তাই সবসময় সাহেল অ্যাপে নিজের হেলথ স্ট্যাটাস যাচাই করে রাখবেন।
৫. অন্যের সিভিল আইডি ব্যবহার করে ওষুধ নেওয়ার চেষ্টা:
বন্ধুর সিভিল আইডি বা কার্ড নিয়ে ক্লিনিকে গিয়ে নিজের নামে চিকিৎসা নেওয়া বা ওষুধ তোলা কুয়েতি আইনে মারাত্মক জালিয়াতি (Forgery) হিসেবে গণ্য হয়। ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক পুলিশে সোপর্দ করা হতে পারে। সবসময় নিজের বৈধ পরিচয়পত্র ব্যবহার করুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. কুয়েতে আকামা নবায়নের বাৎসরিক স্বাস্থ্যবীমা (ধামান সিহি) ফি কত এবং এটি কি কফিল বহন করে নাকি কর্মীকে দিতে হয়?
উত্তর: কুয়েতের শ্রম আইন অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের (আর্টিকেল ১৮) কর্মীদের বাৎসরিক স্বাস্থ্যবীমা ফি নিয়োগকর্তা বা কোম্পানির বহন করার কথা। বর্তমানে বয়স ও ক্যাটাগরি ভেদে এই বাৎসরিক সরকারি স্বাস্থ্যবীমা ফি সাধারণত ৫০ থেকে ১৩০ কুয়েতি দিনার পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে অনেক অসাধু ছোট কোম্পানি কর্মীদের বেতন থেকে এই টাকা কেটে নেয়, যা শ্রম আইনের পরিপন্থী।
২. হঠাৎ গভীর রাতে মারাত্মক অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে সরাসরি কোন হাসপাতালে যেতে হবে?
উত্তর: গভীর রাতে তীব্র শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক বুকের ব্যথা, বড় ধরনের কাটাছেঁড়া বা জরুরি কোনো দুর্ঘটনায় কোনো পলিক্লিনিক বা অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রয়োজন নেই। সরাসরি আপনার নিকটস্থ বড় সরকারি জেনারেল হাসপাতালের (যেমন: ফারওয়ানিয়া হাসপাতাল, সাবাহ হাসপাতাল, মুবারক আল-কাবির হাসপাতাল বা আদন হাসপাতাল) চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকা ইমার্জেন্সি (Casualty) বিভাগে চলে যেতে হবে। সেখানে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
৩. গৃহকর্মী বা খাদেম ভিসার (আর্টিকেল ২০) প্রবাসীরা কি ধামান হাসপাতালে যাবেন নাকি সাধারণ সরকারি ক্লিনিকে?
উত্তর: গৃহকর্মী, ব্যক্তিগত চালক বা বাসাবাড়ির রান্নার কর্মীদের (আর্টিকেল ২০) জন্য ধামান হাসপাতাল ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তারা পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি তাদের আবাসিক এলাকার কুয়েত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের (MOH) স্থানীয় সরকারি পলিক্লিনিক (মুস্তাসওয়াফ) এবং সরকারি জেনারেল হাসপাতালে স্বল্প খরচে নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ গ্রহণ করতে পারবেন।
ডিসক্লেইমার: তথ্যটি কুয়েত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (MOH) ও ধামান হেলথ অ্যাসুরেন্সের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত আপডেট। চিকিৎসাসেবার প্রশাসনিক নিয়ম, ক্লিনিক বণ্টন এবং স্বাস্থ্যবীমার নির্ধারিত ফি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেকোনো সময় পরিবর্তনশীল।
লেখক: Yasin Sarfuddin