টাঙ্গাইলের সিরাজুল ইসলাম কুয়েতের জাহরা এলাকায় একটি কমার্শিয়াল কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ দশ বছর ধরে কাজ করছেন। ২০২৩ সালের পর টানা তিন বছর আর দেশে যাওয়া হয়নি তার। অবশেষে গত রমজানের আগে দুই মাসের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলেন পরিবারের কাছে। দেশে এসে বোনের বিয়ে, বাবার চোখের চিকিৎসা এবং পারিবারিক কিছু জমির কাজ মেটাতে গিয়ে ছুটির সময় পেরিয়ে গেল। সিরাজুল ভাবলেন, "কোম্পানিতে তো আমার কফিল ভালো, প্রতি মাসে সময়মতো খবর নিচ্ছি। ছয় মাসের ভেতরে ফিরলেই তো হলো, আর আকামার মেয়াদ তো এখনো পুরো এক বছর বাকি আছে।"
ছুটির পাঁচ মাস বিশ দিন পার হওয়ার পর ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কুয়েত এয়ারওয়েজের কাউন্টারে যখন তিনি পাসপোর্ট আর সিভিল আইডি জমা দিলেন, তখনই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কাউন্টারের অফিসার কম্পিউটার স্ক্রিনে চেক করে সিরাজুলকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, "সিরাজুল ভাই, কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন সেন্ট্রাল সিস্টেমে আপনার আকামা বাতিল (Cancelled due to absence) দেখাচ্ছে। কারণ আপনি একটানা ১৮০ দিনের অনুমোদিত সময়সীমা অতিক্রম করেছেন এবং কফিলের মাধ্যমে সাহেল অ্যাপে কোনো অতিরিক্ত ছুটির অনুমতিপত্র নেননি। আপনাকে বিমানে তোলা সম্ভব নয়।"
সিরাজুল কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মাত্র কয়েকটা দিনের হিসাব না রাখা এবং কুয়েত সরকারের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল তার এক দশকের প্রবাস জীবনের সমস্ত অর্জন।
সিরাজুলের মতো এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মুখে এখন প্রতিদিন বিমানবন্দরগুলোতে বহু প্রবাসী বাংলাদেশি পড়ছেন। অতীতে বিশেষ ছাড় বা শিথিলতা থাকলেও, কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MOI) দেশের বাইরে অবস্থানের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে কঠোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। কুয়েতের বাইরে টানা কতদিন থাকা যায়, কোন শর্তে ছুটি বাড়ানো যায় এবং আকামা সুরক্ষিত রাখতে কী পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক—তা জানা প্রতিটি প্রবাসীর জন্য এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন।
কুয়েতে ৬ মাসের ছুটির নতুন নিয়ম আসলে কি? নতুন আপডেট কি?
কুয়েতের প্রচলিত অভিবাসন আইনের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ (Article 12 of the Foreigners’ Residence Law) অনুযায়ী, কুয়েতের বৈধ রেসিডেন্সি বা আকামাধারী যেকোনো বিদেশি নাগরিক কুয়েতের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে একটানা সর্বোচ্চ ৬ মাস (বা ১৮০ দিন) পর্যন্ত অবস্থান করতে পারেন। ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট প্রবাসীর আকামা কুয়েত ইমিগ্রেশনের কেন্দ্রীয় সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর বা বাতিল হয়ে যায়। একে স্থানীয় পরিভাষায় ‘সুকুত ইকামা’ (سقوط الإقامة) বলা হয়।
করোনা মহামারীর সময় এবং পরবর্তী সময়ে কুয়েত সরকার প্রবাসীদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর কিছু বিশেষ সুবিধা চালু রেখেছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করে সেই সাময়িক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে।
সর্বশেষ সরকারি আপডেটের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. স্বয়ংক্রিয় ছুটি বৃদ্ধির সুবিধা স্থায়ীভাবে বন্ধ:
এখন আর কোনো ব্যক্তির ছুটির মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। আপনি যে ভিসাধারীই হোন না কেন (আর্টিকেল ১৮ প্রাইভেট সেক্টর, আর্টিকেল ২০ গৃহকর্মী কিংবা আর্টিকেল ২২ ফ্যামিলি ভিসা)—ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার অন্তত এক দিন আগেই কুয়েতের ভূখণ্ডে পা রাখতে হবে।
২. সাহেল অ্যাপের ‘অনলাইন অ্যাবসেন্স পারমিট’ (Absence Permit):
কোনো প্রবাসী যদি বিশেষ চিকিৎসার কারণে, গুরুতর পারিবারিক প্রয়োজনে কিংবা পড়াশোনার জন্য ৬ মাসের বেশি সময় বিদেশে অবস্থান করতে বাধ্য হন, তবে তার কুয়েতে থাকা কফিল বা স্পন্সরকে ওই প্রবাসীর ৬ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সাহেল (Sahel) অ্যাপ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পোর্টালের মাধ্যমে ‘অনলাইন অ্যাবসেন্স পারমিট’ বা অতিরিক্ত ছুটির বিশেষ অনুমতিপত্রের আবেদন করতে হবে। উপযুক্ত কারণ ও সরকারি ফি ছাড়া এই আবেদন এখন খুব সহজে মঞ্জুর করা হচ্ছে না।
৩. এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনের সেন্ট্রাল ডিজিটাল সিঙ্ক:
আগে পাসপোর্টে আসা-যাওয়ার সিলমোহর দেখে ম্যানুয়ালি দিন গণনা করা হতো। এখন কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং প্রতিটি দেশের বহির্গমন ডেস্কে কুয়েত সরকারের ক্লাউড ডাটাবেজ সরাসরি সিঙ্ক করা। আপনার কুয়েত ত্যাগ করার মুহূর্ত থেকে সার্ভারে স্বয়ংক্রিয় কাউন্টডাউন শুরু হয়। ১৮০ তম দিনের মধ্যরাত পার হওয়ামাত্রই সিভিল আইডি ডেটাবেজে সংশ্লিষ্ট কর্মীর স্ট্যাটাস লাল রঙে ব্লক হয়ে যায়।
৪. গৃহকর্মী (আর্টিকেল ২০) ও ফ্যামিলি ভিসার (আর্টিকেল ২২) ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা:
পূর্বে গৃহকর্মী বা সন্তানদের ক্ষেত্রে অনেক সময় কফিল ম্যানুয়াল দরখাস্ত দিয়ে আকামা টিকিয়ে রাখতেন। নতুন বিধানে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আর্টিকেল ২০ এবং আর্টিকেল ২২-এর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা কোনো অবস্থাতেই পূর্বানুমতি ছাড়া একটানা ৬ মাসের বেশি বাইরে থাকতে পারবেন না। মেয়াদ পেরোলে তাদের আকামা স্থায়ীভাবে বাতিল হবে এবং নতুন ভিসা ছাড়া আর কখনোই কুয়েত প্রবেশ করা যাবে না।
এই সংক্রান্ত বিস্তারিত সরকারি পরিপত্র ও অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি দেখতে কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর মূল পোর্টালে নজর রাখা জরুরি।
কাদের জন্য প্রযোজ্য?
কুয়েত সরকারের এই ছয় মাসের নিয়মটি দেশটির ভূখণ্ডে বৈধভাবে বসবাসকারী প্রতিটি প্রবাসীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে ব্যবহারিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিচের মানুষগুলোর জন্য এটি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়:
১. ছুটি নিয়ে দেশে যাওয়া সাধারণ কর্মী (আর্টিকেল ১৮):
কুয়েতের বিভিন্ন কোম্পানি, গ্যারেজ, কারখানা বা রেস্তোরাঁয় কর্মরত কর্মীরা যারা দীর্ঘদিনের জন্য দেশে যান। অনেক সময় দেশে গিয়ে অলসতা করে বা কফিলের ওপর অতিরিক্ত ভরসা করে তারা ৫-৬ মাস কাটিয়ে দেন। তাদের জন্য এই নিয়মটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
২. গৃহকর্মী ও ব্যক্তিগত চালক (আর্টিকেল ২০):
বাসাবাড়িতে কাজ করা নারী ও পুরুষ গৃহকর্মীরা যখন দেশে যান, অনেক সময় কফিল তাদের মৌখিকভাবে বলেন, "তোমার যত দিন ইচ্ছা থেকে আসো।" কিন্তু কফিল যদি সিস্টেমে সরকারি ছুটির অনুমোদন না নেন, তবে ১৮০ দিন পার হলেই ওই গৃহকর্মীর কুয়েতে ফেরার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়।
৩. প্রবাসে থাকা পরিবার ও শিক্ষার্থী সন্তান (আর্টিকেল ২২):
কুয়েতে চাকরি করা বাবার সাথে থাকা স্ত্রী ও সন্তানরা অনেক সময় দেশে গিয়ে বেশি সময় কাটান। বিশেষ করে যেসব সন্তানরা বাংলাদেশে স্কুল বা কলেজে পড়ে কিন্তু কুয়েতের আকামা টিকিয়ে রাখতে চায়, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি চরম সতর্কতার সাথে হিসাব করতে হয়। প্রতি ৬ মাসের মধ্যে অন্তত একবার কুয়েতে এসে হাজিরা না দিলে বা অনলাইনে ছাড়পত্র না নিলে আকামা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
৪. চিকিৎসাধীন ও অসুস্থ প্রবাসী:
যারা কুয়েতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বা অস্ত্রোপচারের জন্য বাংলাদেশে গেছেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে দীর্ঘ বিশ্রামে আছেন। উপযুক্ত মেডিকেল সার্টিফিকেট ছাড়া কেবল অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে ৬ মাসের বেশি বাইরে থাকা এখন আইনত অচল।
কুয়েত প্রবাসীদের জন্য এর প্রভাব ও করণীয়
কুয়েত সরকারের এই কঠোর অভিবাসন নীতির প্রভাব প্রবাসীদের জীবন, পরিবার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
প্রবাসীদের জীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব:
আকামা বাতিল ও কুয়েত প্রবেশের চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: ছয় মাস পূর্ণ হয়ে আকামা বাতিল হয়ে গেলে আপনি আর পুরনো সিভিল আইডি বা ভিসা দিয়ে কুয়েতে ঢুকতে পারবেন না। এর ফলে প্রবাসীর কুয়েতে রেখে আসা ব্যাংক ব্যালেন্স, ফ্ল্যাটের মালামাল, বকেয়া পাওনা ও গ্র্যাচুইটি (মাকসুমা) এক নিমিষে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
নতুন ভিসার দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল জটিলতা: যদি কফিল আবারও আপনাকে কুয়েতে ফিরিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে সম্পূর্ণ নতুন এন্ট্রি ভিসা ইস্যু করতে হবে। যার জন্য পুনরায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ঢাকার গামকা মেডিকেল টেস্ট, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং লাখ টাকার খরচ নতুন করে বহন করতে হবে, যা অনেক সাধারণ প্রবাসীর পক্ষে সম্ভব হয় না।
বিমানবন্দরে চরম হেনস্তা ও টিকিট বাতিলের ক্ষতি: বিমানে ওঠার মুহূর্তে যখন জানা যায় আকামা নেই, তখন ঢাকা বা চট্টগ্রামের এয়ারপোর্ট থেকেই যাত্রীকে ব্যাগসহ বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়। এতে বিমানের টিকিটের পঞ্চাশ থেকে আশি হাজার টাকা পুরোপুরি গচ্ছা যায় এবং পরিবারের সামনে চরম মানসিক অবমাননার শিকার হতে হয়।
প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও অভিবাসন নীতিমালার আন্তর্জাতিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করে দেশের শীর্ষ জাতীয় গণমাধ্যম প্রথম আলো, যা প্রবাসীদের আইনি সচেতনতা তৈরিতে নিয়মিত সহায়তা করে।
কুয়েত প্রবাসীদের জরুরি করণীয়:
১. পাসপোর্টের এক্সিট সিল দেখে ক্যালেন্ডারে দিন গণনা: কুয়েত এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর পাসপোর্টে যে প্রস্থান সিল (Exit Stamp) দেওয়া হয়, সেটির তারিখ দেখে ক্যালেন্ডারে দিন হিসাব করুন। ইংরেজি মাসগুলো সবসময় ৩০ দিনে হয় না; কোনো মাস ৩১ দিনে, আবার ফেব্রুয়ারি ২৮ দিনে হয়। তাই মাস হিসেবে নয়, ক্যালেন্ডারের পাতা গুনে ১৭০ দিনের ভেতরেই কুয়েতে ফিরে আসার ফ্লাইট বুক করুন।
২. সাহেল অ্যাপে স্ট্যাটাস নিয়মিত পরীক্ষা: দেশে অবস্থানকালীন সময়েও আপনার স্মার্টফোনে সাহেল (Sahel) অ্যাপটি সক্রিয় রাখুন। সাহেল অ্যাপের ‘Residency Status’ অপশনে গেলে আপনার ছুটির কাউন্টডাউন এবং কত দিন বিদেশে থাকার অনুমতি বাকি আছে তা স্পষ্ট দেখা যায়।
৩. ছুটি বাড়ানোর প্রয়োজন হলে আগাম কফিলকে জানানো: যদি অনিবার্য কারণে দেশে বেশি দিন থাকতে হয়, তবে আপনার ছুটির ৫ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই (অন্তত ৪ মাস পার হওয়ার সময়) কফিল বা কোম্পানির প্রতিনিধিকে লিখিতভাবে জানান এবং সাহেল বিজনেস পোর্টাল থেকে ‘অনলাইন অ্যাবসেন্স পারমিট’ ইস্যু করিয়ে তার পিডিএফ কপি নিজের কাছে সংগ্রহ করুন।
৪. ফ্লাইটের অন্তত তিন দিন আগে এয়ারলাইন্সে স্ট্যাটাস যাচাই: বিমানে ওঠার আগেই ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার্ভারে আপনার আকামা ‘Valid’ দেখাচ্ছে কিনা তা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে নিন।
Step-by-Step কিভাবে করবেন / বিস্তারিত
কুয়েতের বাইরে থাকার সময় নিজের আকামা নিরাপদে সচল রাখার এবং প্রয়োজনে ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর পূর্ণাঙ্গ ও আইনি ধাপগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
ধাপ ১: কুয়েত ত্যাগের সঠিক তারিখ সংরক্ষণ
আপনি যেদিন কুয়েতের বিমানবন্দর ত্যাগ করেছেন, সেই দিনটিকে ডে-১ (Day 1) হিসেবে নিজের ডায়েরি বা মোবাইলের নোটে লিখে রাখুন।
আপনার টিকিট যদি কোনো কারণে পিছিয়ে যায়, তবুও মাথায় রাখবেন—যেকোনো অবস্থাতেই আপনার কুয়েত পৌঁছানোর তারিখ যেন প্রস্থান দিনের পর থেকে ১৭৫ দিন অতিক্রম না করে। হাতের কাছে ৫ দিনের একটি সেফটি মার্জিন রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
ধাপ ২: কফিলের মাধ্যমে সাহেল অ্যাপে অতিরিক্ত ছুটির আবেদন
যদি অসুস্থতা বা অন্য কোনো আইনি কারণে ১৮০ দিনের বেশি দেশে থাকতে হয়, তবে দেশে বসে আপনি নিজে এটি করতে পারবেন না। কুয়েতে থাকা কফিলকে নিচের পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে বলতে হবে:
কফিল তার স্মার্টফোনে ‘Sahel Business’ বা ‘Sahel’ অ্যাপে প্রবেশ করবেন।
‘Ministry of Interior’ মেন্যু থেকে ‘General Department of Residency’ নির্বাচন করবেন।
‘Absence Permit Outside Kuwait’ (ইজন গিয়াব) অপশনে ক্লিক করবেন।
সেখানে আপনার সিভিল আইডি নম্বর প্রদান করবেন এবং আপনি অতিরিক্ত কত দিন (যেমন ১ মাস বা ৩ মাস) বাইরে থাকতে চান তা সিলেক্ট করবেন।
অতিরিক্ত অবস্থানের কারণ উল্লেখ করতে হবে (যেমন মেডিকেল সার্টিফিকেট বা কোম্পানির লিখিত অ্যাসাইনমেন্ট)।
ধাপ ৩: সরকারি পারমিট ফি পরিশোধ
সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি আবেদনপত্র তৈরি করবে।
কফিলকে তার কুয়েতি ব্যাংক কার্ড (K-Net) দিয়ে নির্ধারিত সরকারি ফি (সাধারণত প্রতি মাসের জন্য নির্দিষ্ট দিনার) পরিশোধ করতে হবে।
পেমেন্ট সফল হওয়ার সাথে সাথে একটি অফিশিয়াল ‘অনলাইন অ্যাবসেন্স পারমিট’ জেনারেট হবে, যাতে একটি নির্দিষ্ট কিউআর (QR) কোড ও রেফারেন্স নম্বর থাকবে।
ধাপ ৪: পারমিটের কপি সংগ্রহ ও এয়ারপোর্টে প্রদর্শন
কফিলকে বলুন ওই পারমিট পেপারটি পিডিএফ আকারে আপনার হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে পাঠিয়ে দিতে।
আপনি সেই অনুমোদিত ছুটির কাগজটি স্পষ্ট কাগজে প্রিন্ট করে নিন।
দেশে বিমান ভ্রমণের দিন চেক-ইন কাউন্টারে আপনার মূল পাসপোর্ট, সিভিল আইডি এবং এই অতিরিক্ত ছুটির পারমিটের প্রিন্ট কপি একসাথে উপস্থাপন করুন। কাউন্টার অফিসার সিস্টেমে কিউআর কোড স্ক্যান করে আপনাকে বোর্ডিং পাস ইস্যু করবেন।
ধাপ ৫: কুয়েতে অবতরণের পর সিভিল আইডি স্ট্যাটাস নিশ্চিতকরণ
কুয়েতে পৌঁছানোর পর পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘Kuwait Mobile ID’ (হুয়িতী) অ্যাপটি ওপেন করে রিফ্রেশ করুন।
দেখুন আপনার ডিজিটাল সিভিল আইডির ব্যাকগ্রাউন্ড সবুজ আছে কিনা। সবুজ থাকার অর্থ হলো আপনার অভিবাসন রেকর্ড সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সচল রয়েছে।
সাধারণ ভুল ও জটিলতা এড়াতে সতর্কতা
ছুটিতে দেশে যাওয়ার পর প্রবাসীদের অসাবধানতার কারণে ঘটে যাওয়া সাধারণ ভুলগুলো সম্পর্কে এখনই সতর্ক হোন:
১. "আকামা তো দুই বছর আছে, সমস্যা নেই"—এই ভ্রান্ত ধারণা:
অনেকে মনে করেন পাসপোর্টে বা সিস্টেমে আকামার মেয়াদ তো এখনো দেড় বছর বাকি আছে, তাই ছয় মাস পার হলেও ক্ষতি হবে না। এটি চরম মারাত্মক ভুল। কুয়েতের আইনে আকামার মেয়াদ যত বছরই থাকুক না কেন, আপনি যদি অনুমতি ছাড়া টানা ১৮০ দিন দেশের বাইরে কাটান, তবে সেই বহু বছরের মেয়াদী আকামাও তাৎক্ষণিক বাতিল হয়ে যায়।
২. ছুটির শেষ সপ্তাহে ফ্লাইট রাখা:
অনেকেই ঠিক ১৭৯ তম দিনে কুয়েতে ফেরার টিকিট কাটেন। কোনো কারণে যদি ওই দিন ফ্লাইট বাতিল হয়, আবহাওয়ার কারণে বিমান বিলম্বিত হয় কিংবা শারীরিক অসুস্থতায় আপনি বিমানে উঠতে না পারেন এবং সময়টি ১৮১ তম দিনে গড়ায়—তবে কুয়েতের কেন্দ্রীয় সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার আকামা চিরতরে বন্ধ করে দেবে। তখন শত অনুরোধ করেও এয়ারলাইন্স আপনাকে বিমানে নিতে পারবে না।
৩. মেডিকেল সার্টিফিকেটের নামে ভুয়া কাগজ তৈরি:
দেশে বসে কোনো ভুয়া ক্লিনিক থেকে প্রেসক্রিপশন বা অসুস্থতার জাল কাগজ বানিয়ে কফিলকে দিয়ে দূতাবাসে বা মন্ত্রণালয়ে জমা দেবেন না। কুয়েত কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে আসা মেডিকেল রিপোর্টগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাস থেকে নোটারি ভেরিফিকেশন ছাড়া গ্রহণ করে না। জালিয়াতির প্রমাণ মিললে স্পন্সরের ফাইল ব্লক হতে পারে।
৪. কফিলের মৌখিক আশ্বাসে অন্ধবিশ্বাস:
ফোনে কফিল হয়তো বলবে—"সমস্যা নেই, তুমি থাকো, আমি কম্পিউটার থেকে সব ঠিক করে দিয়েছি।" অন্ধের মতো কফিলের মুখের কথায় বিশ্বাস করবেন না। কফিলকে বলুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল অ্যাপ্রুভাল পেপারের ছবি পাঠাতে। সাহেল অ্যাপে চেক করে সবুজ স্ট্যাটাস না দেখা পর্যন্ত দেশে অতিরিক্ত দিন কাটাবেন না।
৫. ট্রানজিট ফ্লাইটের সময় হিসাব না রাখা:
বাংলাদেশ থেকে কুয়েত আসার পথে যদি কানেক্টিং ফ্লাইট (যেমন শারজাহ, দোহা বা বাহরাইনে ট্রানজিট) থাকে, তবে ট্রানজিটের সময় মিলিয়ে আপনি কখন কুয়েত বিমানবন্দরে নামছেন সেই সময়টি হিসাব করুন। আপনি ঢাকায় বিমানে উঠলেই হবে না; কুয়েতের ইমিগ্রেশন গেট পার হওয়ার সময়টি ১৮০ দিনের মধ্যে হওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. কুয়েতে টানা কতদিন বাইরে থাকলে আকামা বাতিল হয় এবং দিন কি ১৮০ দিন নাকি হুবহু ৬ মাস?
উত্তর: কুয়েত অভিবাসন আইন অনুযায়ী একজন প্রবাসী দেশের বাইরে টানা সর্বোচ্চ ১৮০ দিন (বা ৬ ক্যালেন্ডার মাস) অবস্থান করতে পারেন। ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার পরদিনই কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার্ভারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রেসিডেন্সি পারমিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে অচল বা বাতিল হয়ে যায়।
২. ছয় মাস পার হয়ে আকামা বাতিল হয়ে গেলে কি কোনো জরিমানার মাধ্যমে তা পুনরায় নবায়ন করা সম্ভব?
উত্তর: না, সাধারণ নিয়মে একবার ১৮০ দিন পূর্ণ হয়ে আকামা সিস্টেমে বাতিল (Cancelled) হয়ে গেলে কোনো জরিমানা দিয়ে সেই পুরনো আকামা জীবিত বা নবায়ন করার কোনো আইনি সুযোগ থাকে না। একমাত্র উপায় হলো—কুয়েতি কফিলকে আবার নতুন করে কাজের ভিসা (ওয়ার্ক পারমিট) ইস্যু করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীকে নতুন ভিসা নিয়ে পুনরায় মেডিকেল ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পন্ন করে কুয়েতে প্রবেশ করতে হবে।
৩. সাহেল অ্যাপের মাধ্যমে ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন কি কর্মী নিজে দেশ থেকে করতে পারেন?
উত্তর: না, কর্মী নিজে বাংলাদেশ থেকে এই ছুটির আবেদন করতে পারেন না। কারণ এই ছুটির অনুমতি দেওয়ার আইনি অধিকার কেবল কুয়েতে থাকা মূল স্পন্সর বা কোম্পানির অনুমোদিত প্রতিনিধির (মন্দুব) হাতে থাকে। কফিলকে তার নিজস্ব সাহেল বিজনেস অ্যাপ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেসিডেন্সি পোর্টালে লগইন করে সরকারি ফি পরিশোধের মাধ্যমে ছুটির মেয়াদ বাড়াতে হয়।
ডিসক্লেইমার: তথ্যটি কুয়েত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট রেসিডেন্সি বিভাগের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত আপডেট। কুয়েতের অভিবাসন আইন ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নীতিমালা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিবর্তনশীল। যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী ছুটির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পূর্বে কফিল বা অফিশিয়াল পোর্টাল থেকে বর্তমান নিয়ম যাচাই করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
লেখক: Yasin Sarfuddin