প্রবাস জীবনে পা দেওয়ার পর একজন মানুষের সবচেয়ে বড় যে ভুল ভাঙে, তা হলো— "বিদেশে মনে হয় টাকার গাছ আছে!" আর দ্বিতীয় যে চরম সত্যের মুখোমুখি তাকে হতে হয়, তা হলো— "মায়ের হাতের রান্নার কোনো বিকল্প নেই।"
ডিউটি শেষে ক্লান্ত শরীরে রুমে ফিরে যখন একজন প্রবাসী ব্যাচেলর রান্নাঘরে ঢোকে, তখন সেখানে এক মহাকাব্যিক যুদ্ধ শুরু হয়। প্রবাসী টাইম-এর আজকের এই রম্য রচনায় চলুন দেখে আসি একজন প্রবাসীর রান্নার সেই ভয়ংকর সুন্দর অভিজ্ঞতা!
প্রথম ধাপ: ইউটিউবের মাস্টারশেফ
রান্নাঘরে ঢোকার আগে আমাদের প্রবাসী ভাই ইউটিউবে ঢুকে যান। সার্চ বক্সে লেখেন, "খুব সহজে ১০ মিনিটে মুরগি রান্নার উপায়।" ভিডিওতে দেখা যায় এক আপু হাসিমুখে বলছেন, "প্রথমে পরিমাণমতো পেঁয়াজ কুচি দিন।"
সমস্যা হলো এই "পরিমাণমতো" শব্দটা নিয়ে। প্রবাসীর কাছে পরিমাণমতো মানে হলো— যা আছে সব ঢেলে দাও! ইউটিউবের আপুর ১০ মিনিটের রান্না প্রবাসীর জীবনে ২ ঘণ্টার এক সংগ্রাম হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় ধাপ: পেঁয়াজ কাটার কান্না ও পোড়া গন্ধ
পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে প্রবাসীর চোখ দিয়ে যে পরিমাণ পানি বের হয়, তা দিয়ে অনায়াসে এক পাতিল ডাল রান্না করে ফেলা যায়। এরপর কড়াইতে তেল দিয়ে পেঁয়াজ ভাজার পালা।
ডিউটির ক্লান্তিতে পেঁয়াজ ভাজতে ভাজতে হঠাৎ তিনি হয়তো একটু ফেসবুক স্ক্রল করতে শুরু করেন। হঠাৎ পোড়া গন্ধে হুঁশ ফেরে! ততক্ষণে কড়াইয়ের পেঁয়াজগুলো আফ্রিকার কয়লার মতো কালো হয়ে গেছে। অগত্যা সেই পোড়া পেঁয়াজের ওপরই আদা-রসুন বাটা ঢেলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়।
তৃতীয় ধাপ: মুরগি যখন চুইংগাম বা রাবার
প্রবাসীদের রান্নার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মুরগির মাংস। মসলা কষানোর পর মাংস দিয়ে তারা এমনভাবে জাল দিতে থাকেন, যেন মুরগির ভেতরে থাকা সব পাপ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।
এক ঘণ্টা সেদ্ধ করার পর যখন খেতে বসেন, তখন দেখা যায় মুরগির পিসগুলো রাবার বা চুইংগামের মতো হয়ে গেছে। চিবানো যায়, কিন্তু গেলা যায় না! তবুও নিজের হাতের রান্না বলে কথা, চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সেই রাবার-মুরগিই অমৃতের মতো খেতে হয়।
চতুর্থ ধাপ: ডাল যখন আটলান্টিক মহাসাগর
ব্যাচেলর প্রবাসীদের জাতীয় খাবার হলো ডাল আর ডিম ভাজি। ডাল রান্না করা নাকি সবচেয়ে সোজা। কিন্তু প্রবাসীর ডাল কখনো সাধারণ ডাল থাকে না, সেটি হয়ে যায় আটলান্টিক মহাসাগর!
এক মুঠো ডালে এক জগ পানি ঢেলে এমন এক স্যুপ তৈরি হয়, যেখানে ডাল খুঁজে পাওয়ার জন্য ডুবুরি নামাতে হয়। সেই পানিতে ভাসতে থাকা দুই-একটা কাঁচামরিচ যেন মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ!
এত সব সংগ্রাম, পোড়া গন্ধ আর রাবার-মুরগি খাওয়ার পর যখন দেশে থাকা মায়ের ফোন আসে—
"হ্যালো বাবা, আজ কী খেলি?"
তখন সব কষ্ট লুকিয়ে আমাদের প্রবাসী ভাইটি হাসিমুখে বলে, "মা, আজ মুরগির মাংস আর ডাল রান্না করেছিলাম। অনেক মজা হয়েছে, একদম তোমার হাতের রান্নার মতো!"
প্রবাসীদের এই হাসি আর মিথ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক বুক কষ্ট আর হাড়ভাঙা পরিশ্রম। আপনার ব্যাচেলর জীবনের রান্নার সবচেয়ে মজার বা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা কোনটি? কমেন্ট করে জানিয়ে দিন প্রবাসী টাইম-এর পাঠকদের!