যাতায়াত ব্যবস্থা যেকোনো শহরের প্রাণভোমরা। বিশ্বের একেকটি শহর যেন একেকটি নির্দিষ্ট যানবাহনের পরিচয়ে পরিচিত। কোথাও সাইকেলের টুংটাং শব্দ আভিজাত্যের প্রতীক, আবার কোথাও ব্যক্তিগত গাড়ির হর্ন ডেকে আনে পরিবেশ দূষণের লজ্জা। শহরের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই বৈচিত্র্যময় পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের গর্ব ও আক্ষেপের শেষ নেই। বিশ্বের কোন শহরে কোন যানের আধিপত্য বেশি এবং এর পেছনের সুবিধা, ক্ষতি ও বিশ্বরেকর্ডের সমীকরণগুলো নিয়ে আজ আমরা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম এবং ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরকে বলা হয় সাইকেলের স্বর্গরাজ্য। ইউরোপের এই শহরগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির চেয়ে সাইকেলের সংখ্যা বেশি। আমস্টারডামে সাইকেল চালানো কোনো দারিদ্র্যের লক্ষণ নয়, বরং এটি পরিবেশ সচেতনতা ও আভিজাত্যের প্রতীক। নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট (Utrecht) শহরে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইকেল পার্কিং গ্যারেজ, যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে। সাইকেল চালানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি শতভাগ পরিবেশবান্ধব এবং মানুষের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করে। তবে তীব্র শীত বা বৃষ্টির সময় সাইকেল চালানো বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও, কার্বন নিঃসরণ কমানোর এই যুগে সাইকেল আরোহীরা সমাজে অত্যন্ত সম্মানের চোখে মূল্যায়িত হন।
অন্যদিকে, এশিয়ার কিছু শহরে মোটরসাইকেল এবং স্কুটির একচেটিয়া রাজত্ব। ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি এবং তাইওয়ানের তাইপেই শহরে লাখ লাখ স্কুটি প্রতিদিন রাস্তায় নামে। সরু গলি এবং যানজটপূর্ণ রাস্তায় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য স্কুটির কোনো বিকল্প নেই। তবে এই সুবিধার বিপরীতে রয়েছে ভয়াবহ ক্ষতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্রাতিরিক্ত মোটরসাইকেলের কারণে এসব শহরে মারাত্মক বায়ুদূষণ এবং শব্দদূষণ ঘটে। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার হারও এই শহরগুলোতে উদ্বেগজনকভাবে বেশি, যা প্রায়শই আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের নয়াদিল্লিতে অটোরিকশা বা সিএনজির আধিপত্য বেশি, যা সস্তা যাতায়াতের মাধ্যম হলেও কার্বন নিঃসরণে বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বজুড়ে 'রিকশার রাজধানী' হিসেবে পরিচিত। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যমতে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্যাডেল চালিত রিকশা চলে ঢাকা শহরে। এটি পরিবেশবান্ধব এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান করলেও, ধীরগতির কারণে শহরের ভয়াবহ যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে একে দায়ী করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শহরগুলোর যাতায়াত ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ পরিবর্তন এসেছে। প্যাডেল চালিত রিকশার জায়গা এখন পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে লাখ লাখ অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজি বাইক। বর্তমানে এই শহরগুলোর অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়কে সবচেয়ে বেশি দাপট দেখা যায় এই যানটির। সস্তা ও দ্রুত যাতায়াতের মাধ্যম হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয় হলেও, এর ক্ষতিকর দিকগুলো রীতিমতো আতঙ্কজনক। প্রথমত, এসব অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করার জন্য প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, যা দেশের লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। দ্বিতীয়ত, কাঠামোগত দুর্বলতা, মানহীন ব্রেক এবং অদক্ষ চালকের কারণে এই যানগুলো প্রতিনিয়ত মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এছাড়া, অকেজো সীসাযুক্ত (Lead-acid) ব্যাটারিগুলো যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়ার ফলে মাটি ও পানিতে ভয়াবহ বিষাক্ত দূষণ ছড়াচ্ছে। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চলা এই ব্যাটারিচালিত যানগুলো এখন নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য এক বিশাল লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণপরিবহনের ক্ষেত্রে জাপানের টোকিও শহর এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। টোকিও শহরের মেট্রো এবং ট্রেন ব্যবস্থা বিশ্বের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ও ব্যস্ততম। টোকিওর 'শিনজুকু স্টেশন' প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ যাত্রী পরিবহন করে বিশ্বের ব্যস্ততম রেলওয়ে স্টেশন হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পেয়েছে। জাপানিদের কাছে ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা এক বিশাল সম্মানের বিষয়। ট্রেন এক মিনিট দেরি করলেও কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়। তবে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কারণে অফিস টাইমে ট্রেনে ওঠা একটি ভীতিকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়, যেখানে যাত্রীদের ভেতরে ঢোকানোর জন্য 'ওশিয়া' বা পুশার (Pushers) নামক কর্মীদের নিয়োগ দিতে হয়, যা অনেক সময় মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস বা টেক্সাসের হিউস্টনের মতো শহরগুলোতে আবার ব্যক্তিগত গাড়ির (কার) আধিপত্য। সেখানে গাড়ি ছাড়া জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। বিলাসবহুল গাড়ি সেখানে সামাজিক মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ির এই আধিক্য শহরগুলোকে কার্বন নিঃসরণের কারখানায় পরিণত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে অতিরিক্ত গাড়ি ব্যবহারকে এখন ইউরোপের অনেক দেশে 'লজ্জা' বা 'ফ্লাইগস্ক্যাম' (পরিবেশ দূষণের লজ্জা) হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিটি শহরের পরিবহন ব্যবস্থার নিজস্ব কিছু সুবিধা এবং মারাত্মক কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মতো অপরিকল্পিত যানের দৌরাত্ম্য কমিয়ে গণপরিবহন উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে সাইকেল, বৈদ্যুতিক বাস এবং উন্নত মেট্রো ব্যবস্থার প্রসার ঘটানোই আধুনিক শহরগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। যাতায়াত ব্যবস্থা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়, এটি একটি শহরের চরিত্র এবং তার নাগরিকদের মানসিকতার সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি।