নীল আলোর ফাঁদ ও অর্কর গল্প

0


 অর্কর বয়স এখন তেরো। এই বয়সটা এক অদ্ভুত সময়, চারপাশের সবকিছু নিয়ে এক তীব্র কৌতূহল কাজ করে। অর্ক পড়াশোনায় ভালো, বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলতেও ভালোবাসে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে তার একটা গোপন জগৎ তৈরি হয়েছে। রাতের বেলা যখন ঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, অর্ক তখন কম্বলের নিচে মোবাইল স্ক্রিনের তীব্র নীল আলোয় ডুবে যায়। সে এমন কিছু ওয়েবসাইট দেখতে শুরু করেছে, যা তার বয়সের সাথে একেবারেই যায় না।

শুরুটা হয়েছিল কৌতুহল থেকে, কিন্তু আস্তে আস্তে এটা একটা নেশার মতো হয়ে গেল। প্রথম প্রথম অর্কর মনে হতো—"আমি তো জাস্ট দেখছি, এতে কার কী ক্ষতি হচ্ছে?" কিন্তু ক্ষতিটা যে খুব গোপনে, তার নিজের ভেতরেই হচ্ছিল, সেটা সে টের পাচ্ছিল না।

পরিবর্তনের শুরু

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এলো অর্কর মনে। আগে সে যখন নামাজে দাঁড়াতো বা সৃষ্টিকর্তার কথা ভাবত, তার মন শান্ত থাকত। এখন তার মনের ভেতর এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। সে পবিত্র মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে কিছু চাইতে পারে না, কারণ তার অবচেতন মন তাকে অনবরত দোষী সাব্যস্ত করে। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মনের যে পবিত্রতা তাকে এতদিন একটা মানসিক শক্তি দিত, সেটা আস্তে আস্তে ম্লান হতে শুরু করল।

পারিবারিক জীবনেও এর প্রভাব পড়ল। অর্ক খেয়াল করল, সে এখন আর আগের মতো মা-বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সহজে কথা বলতে পারে না। মা যখন ভালোবেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, অর্কর ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। এক ধরণের মিথ্যা আর লুকোচুরির দেয়াল তৈরি হতে থাকল তার আর তার পরিবারের মাঝখানে। সে ক্রমশ একা হয়ে যেতে লাগল, মেজাজ খিটখিটে হতে শুরু করল।

সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়

স্কুলেও এর একটা বড় ধাক্কা লাগল। ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চের অর্ক এখন পেছনের বেঞ্চে বসে ঝিমায়। স্ক্রিনের অবাস্তব দুনিয়া আর আসল দুনিয়ার মধ্যে সে মেলাতে পারছিল না। এই সাইটগুলো মানুষকে এক ধরণের কৃত্রিম, বিকৃত এবং অবাস্তব ধারণা দেয়। ফলে, অর্কর মাথায় সারাক্ষণ ওইসব চিন্তা ঘুরপাক খেত। পড়াশোনায় মনোযোগ সম্পূর্ণ চলে গেল। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় সে নিজেকে গুটিয়ে নিল, কারণ তার মনে হতো সে সবার চেয়ে আলাদা, অপরাধী।

একদিন অর্ক ইন্টারনেটে সাইকোলজি নিয়ে একটি আর্টিকেলে পড়ল—এই বয়সে যারা এই ধরণের আসক্তিতে পড়ে, তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যৎ জীবনে যখন তারা বাস্তব সম্পর্কে জড়ায়, তখন তারা তীব্র হতাশায় ভোগে। কারণ ইন্টারনেটের ওই জগৎটা সম্পূর্ণ ভুয়া এবং সাজানো। বাস্তবে মানুষ হিসেবে অন্যকে সম্মান করার ক্ষমতাটাই লোপ পেয়ে যায় এই আসক্তির কারণে। সমাজ ও পরিবারে একজন দায়িত্বশীল এবং সম্মানিত পুরুষ হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন, তা এই নীল আলোর ফাঁদে পড়ে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।

অর্কর সিদ্ধান্ত

আর্টিকেলটি পড়ার পর অর্ক অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। সে বুঝতে পারল, সে এক ভয়াবহ চোরাবালির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা তার ধর্মীয় পবিত্রতা নষ্ট করছে, মা-বাবার বিশ্বাস ভাঙছে এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। তার মনে হলো, একটা ভুল কৌতূহলের জন্য সে কেন নিজের পুরো জীবনটা ধ্বংস করবে?

সেদিনই অর্ক মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করল। সে নিজেকে বোঝাল, "আমি কোনো দুর্বল মানুষ নই।" সে তার ফোনের সব হিস্ট্রি ডিলিট করে দিল, ব্রাউজারে রেস্ট্রিকশন অন করল। রাতে ঘুমানোর সময় ফোনটা ঘরের এক কোণায় রেখে দিতে শুরু করল।

প্রথম কয়েকদিন একটু কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু অর্ক হাল ছাড়েনি। সে আবার বিকেলে মাঠে বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলা শুরু করল, মায়ের সাথে রান্নাঘরে গিয়ে গল্প করা শুরু করল। এক মাসের মধ্যে অর্ক তার মনের সেই হারিয়ে যাওয়া শান্তিটা ফেরত পেল। এখন সে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ায়, নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারে। কারণ সে জানে, সে একটা অন্ধকার ফাঁদ থেকে নিজেকে মুক্ত করে আলোর পথে ফিরে এসেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!